Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড : জাতীয় চেতনা নির্মূলের চেষ্টা ও আজকের বাংলাদেশ।। গৌরাঙ্গ নন্দী

  • গৌরাঙ্গ নন্দী

বাঙালির সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায় হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলা ভাষাভিত্তিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ-এর আবির্ভাব। উনিশশ’ একাত্তরে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর সম্মিলিত কমকাণ্ডের কাছে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। যুদ্ধে বিজয়ের ঠিক আগে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এ  দেশীয় দোসর – রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী বাংলাদেশের অসংখ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকদের চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে তাঁদেরকে নির্যাতনের পর হত্যা করে। পরিকল্পিত হত্যাকণ্ডের শিকার এসব মানুষের মৃতদেহ ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে ও গণকবরে পাওয়া যায়। বিজয় অর্জনের পর নিকট আত্মীয়রা মিরপুর ও রাজারবাগ বধ্যভূমিতে তাঁদের স্বজনের মৃতদেহ সনাক্ত করেন। এছাড়াও গোটা যুদ্ধ-সময়ে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী বাংলাদেশের জ্ঞানী-গুণী ও মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের হত্যা করে। সাধারণভাবে একেই আমরা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড বলি। তবে দিবস হিসেবে আমরা ১৪ ডিসেম্বরকে পালন বা স্মরণ করি, কারণ ওই দিনটিতেই অনেক বেশী সংখ্যক বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। তাই দিনটিকে আমরা শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস বলি।

প্রকৃতপক্ষে, ১৯৭১-এর ডিসেম্বর মাসে, যুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বুঝতে পারে যে, তাদের পক্ষে আর যুদ্ধে জেতা সম্ভব নয়, তখন তারা নতুন এই দেশটির সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত দিকটি তথা বাঙালি চেতনার ধারক-বাহক ও চর্চায় নিয়োজিত অগ্রগণ্য ব্যক্তিদের হত্যা করার পকিল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৪ ডিসেম্বর রাতে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিজ নিজ গৃহ হতে তুলে নিয়ে যায়। তাঁদের অনেকের লাশ শনাক্ত করা যায়নি, অনেকের লাশ পাওয়া যায়নি। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের স্মরণে বাংলাদেশের ঢাকায় বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ স্থাপন করা হয়েছে।

২.

সাধারণভাবে বলা হয়, যারা দৈহিক শ্রমের বদলে মানসিক শ্রম বা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম দেন তারাই বুদ্ধিজীবী। ২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ‘শহিদ বুদ্ধিজীবী’দের সংজ্ঞা চূড়ান্ত করা হয়। সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ৩১ জানুয়ারি ১৯৭২ পর্যন্ত সময়কালে যেসব বাঙালি সাহিত্যিক, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী, রাজনীতিক, সমাজসেবী, সংস্কৃতিসেবী, চলচ্চিত্র, নাটক ও সংগীতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং এর ফলে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী কিংবা তাদের সহযোগীদের হাতে শহিদ কিংবা ওই সময়ে চিরতরে নিখোঁজ হয়েছেন, তাঁরা শহিদ বুদ্ধিজীবী।’

১৯৭১ সালে বছরব্যাপী পাকিস্তান সেনাবাহিনী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। পরিকল্পিতভাবে ১৪ ডিসেম্বরে সবচেয়ে বেশীসংখ্যক বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছিল; একারণে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ এই দিনকে ‘শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ ঘোষণা করেন। বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত ‘শহিদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ’ (১৯৯৪) থেকে জানা যায়, ২৩২ জন বুদ্ধিজীবী নিহত হয়েছেন। তবে তালিকায় অসম্পূর্ণতার কথাও একই গ্রন্থে স্বীকার করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের ১৮, মতান্তরে ১৯ তারিখে বেসরকারীভাবে গঠিত বুদ্ধিজীবী নিধন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। এরপর ‘বুদ্ধিজীবী তদন্ত কমিটি’ গঠিত হয়। এই কমিটির প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়, রাও ফরমান আলী এদেশের ২০,০০০ বুদ্ধিজীবীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এই পরিকল্পনা মতো হত্যাযজ্ঞ চলেনি। কারণ ফরমান আলীর লক্ষ্য ছিল শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদেরকে গভর্নর হাউজে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা। বুদ্ধিজীবী তদন্ত কমিটির প্রধান জহির রায়হান বলেছিলেন, ‘এরা নির্ভুলভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনষ্ক বুদ্ধিজীবীদেরকে বাছাই করে আঘাত হেনেছে’। দু:খজনক হচ্ছে, ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি জহির রায়হান নিখোঁজ হন।

মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণ হতে দেখা যায়, ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনার সাথে সাথেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা অপারেশন চলাকালীন সময়ে খুঁজে-খুঁজে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে ২৫শে মার্চের রাতেই হত্যা করা হয়।  যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের প্রশিক্ষিত আধা-সামরিক বাহিনী আল-বদর এবং আল-শামস বাহিনী একটি তালিকা তৈরি করে, যেখানে এই সব স্বাধীনতাকামী বুদ্ধিজীবীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে এ কাজের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি। কারণ, স্বাধীনতার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত বঙ্গভবন থেকে তাঁর স্বহস্তে লিখিত ডায়েরি পাওয়া যায় যাতে অনেক নিহত ও জীবিত বুদ্ধিজীবীর নাম পাওয়া যায়। এছাড়া আইয়ুব শাসনামলের তথ্য সচিব আলতাফ গওহরের এক সাক্ষাৎকার হতে জানা যায় যে, ফরমান আলীর তালিকায় তাঁর বন্ধু কবি সানাউল হকের নাম ছিল। আলতাফ গওহরের অনুরোধক্রমে রাও ফরমান আলি তাঁর ডায়েরির তালিকা থেকে সানাউল হকের নাম কেটে দেন। এছাড়া আল-বদরদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা তিনিই করেছিলেন বলে তাঁর ডায়েরিতে একটি নোট পাওয়া যায়। এছাড়াও তার ডায়েরিতে হেইট ও ডুসপিক নামে দুজন মার্কিন নাগরিকের কথা পাওয়া যায়। এদের নামের পাশে ইউএসএ এবং ডিজিআইএস লেখা ছিল। এরমধ্যে হেইট ১৯৫৩ সাল থেকে সামরিক গোয়েন্দা-বাহিনীতে যুক্ত ছিলেন এবং ডুসপিক ছিলেন সিআইএ এজেন্ট। এ কারণে সন্দেহ করা হয়ে থাকে, পুরো ঘটনার পরিকল্পনায় সিআইএ’র ভূমিকা ছিল।

যুদ্ধকালের শেষ পর্বে – ডিসেম্বরের ৪ তারিখ হতে ঢাকায় কারফিউ জারি করা হয়। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ হতে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি নেয়া হয়। মূলত ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনার মূল অংশ বাস্তবায়ন করা হয়। সেদিন প্রায় ২০০ জনের মত বুদ্ধিজীবীকে তাঁদের বাসা হতে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। এমনকি, আত্মসমর্পণ ও যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পরেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তার সহযোগীদের গোলাগুলির অভিযোগ পাওয়া যায়। এমনই একটি ঘটনায়, ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের ৩০ তারিখ স্বনামধন্য চলচ্চিত্র-নির্মাতা জহির রায়হান প্রাণ হারান। এর পেছনে সশস্ত্র উর্দু-ভাষীদের (বিহারী) হাত ছিল বলে সন্দেহ করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীকে সহযোগিতা ও হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করে জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক গঠিত কুখ্যাত আল বদর বাহিনী। বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রধান ঘাতক ছিল বদর বাহিনীর চৌধুরী মঈনুদ্দীন (অপারেশন ইন-চার্জ) ও আশরাফুজ্জামান খান (প্রধান জল্লাদ)। ১৬ ডিসেম্বরের পর আশরাফুজ্জামান খানের নাখালপাড়ার বাড়ি থেকে তার একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি উদ্ধার করা হয়, যার দুটি পৃষ্ঠায় প্রায় ২০ জন বুদ্ধিজীবীর নাম ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কোয়ার্টার নম্বরসহ লেখা ছিল। তার গাড়ির ড্রাইভার মফিজুদ্দিনের দেয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী রায়ের বাজারের বিল ও মিরপুরের শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি হতে বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর গলিত লাশ পাওয়া যায়, যাদের সে নিজ হাতে গুলি করে মেরেছিল। এই চৌধুরী মঈনুদ্দীন ৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিল। সে অবজারভার ভবন হতে বুদ্ধিজীবীদের নাম ঠিকানা রাও ফরমান আলী ও ব্রিগেডিয়ার বশীর আহমেদকে পৌঁছে দিত। এছাড়া আরো ছিলেন এ বি এম খালেক মজুমদার (শহীদুল্লা কায়সারের হত্যাকারী), মাওলানা আবদুল মান্নান (ডাঃ আলীম চৌধুরীর হত্যাকারী), আবদুল কাদের মোল্লা (কবি মেহেরুন্নেসার হত্যাকারী) প্রমুখ। চট্টগ্রামে প্রধান হত্যাকারী ছিলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী ও তার দুই ছেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং গিয়াস কাদের চৌধুরী।

তাজউদ্দিন আহমেদ একটি তদন্ত কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেন ১৯৭১ সালের ৩১শে ডিসেম্বর। কিন্ত, তার ঐ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। ১৯৭১ সালের ২৭ ডিসেম্বর দৈনিক আজাদের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনাটি পূর্বেই করা হয় আর এতে সহায়তা করে জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্র সংগঠন ছাত্রসংঘ। এ হত্যাকাণ্ডে সবচেয়ে সক্রিয় ছিলেন ব্রি. জে. আসলাম, ক্যাপ্টেন তারেক, কর্ণেল তাজ, কর্ণেল তাহের, ভিসি প্রফেসর ডঃ সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, ডঃ মোহর আলী, আল বদরের এবিএম খালেক মজুমদার, আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাইনুদ্দিন; এদের নেতৃত্ব দেয় মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী।

হত্যাকাণ্ডের শিকার হন শিক্ষাবিদ ৯৯১ জন, সাংবাদিক ১৩ জন, চিকিৎসক ৪৯ জন, আইনজীবী ৪২ জন এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী ও প্রকৌশলী মিলিয়ে ১৬ জন। ১৯৭২ সালে জেলাওয়ারি শিক্ষাবিদ ও আইনজীবীদের একটি আনুমানিক তালিকা প্রকাশিত হয়।

১৯৯৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনায় রমনা থানায় প্রথম মামলা দায়ের করা হয় (মামলা নম্বর ১৫)। সেখানে আলবদর বাহিনীর চৌধুরী মাইনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানকে আসামি করা হয়। মামলাটি দায়ের করেন অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিনের বোন ফরিদা বানু।

১৯৭১ বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড - উইকিপিডিয়া

৩.

ধর্মকে প্রধান উপজীব্য করে ১৯৪৭ সালে ইংরেজরা ভারতবর্ষকে দুই ভাগে ভাগ করে। হিন্দুদের দেশ – ‘হিন্দুস্থান’ (ভারত) এবং মুসলিমদের দেশ – ‘পাকিস্তান’ নামে দুটো দেশের যাত্রা শুরু হয়। সেই পাকিস্তানের দুটো অংশ ছিল -একটি পশ্চিম দিকে, নাম তার ‘পশ্চিম পাকিস্তান’; আর একটি পূর্ব দিকে, নাম তার ‘পূর্ব পাকিস্তান’। যদিও শুরুর দিকে একে ‘পূর্ব বাংলা’ বলা হতো। এর কারণ, খুবই পরিষ্কার, এটি ছিল বাংলার পূর্ব অংশ। যেহেতু ১৯৪৭এ এখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, তাই তারা পাকিস্তানের মধ্যে পড়ে। অবশ্য, পাকিস্তানের এই দুটো অংশের মানুষের মধ্যে একমাত্র ধর্ম ছাড়া আর কোন মিল ছিল না।

ধর্মই প্রধান বিবেচ্য থাকায় হিন্দুস্তান হতে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষেরা যেমন পাকিস্তানে যায়; আবার পাকিস্তান হতে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা ভারতে যায়। এই স্থানান্তরকে (মাইগ্রেশন) কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞের ঘটনাও ঘটে। অবশ্য, দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মানসিক বিরোধ এবং এর বহি:প্রকাশ হিসেবে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ছোটখাট বিরোধ হতে থাকে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ এবং বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে প্রধান দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়, এবং বাড়তে থাকে। স্থানে স্থানে সাম্প্রদায়িক সংঘাত শুরু হয়। সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। বিস্ময়ের ঘটনা হচ্ছে, কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু, বাবুগোষ্ঠীর যে সদস্যরা বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তারাই বা তাদের উত্তরসূরীদের অতি-উৎসাহে ১৯৪৭এ বঙ্গ বিভাজনের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনাবলিতে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পর্বত-সমান মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। পরষ্পরের মধ্যে আস্থাহীনতা দেখা দেয়, নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। অনিবার্য পরিণতিতে দেশভাগ তথা স্বাধীনতার পর্বে দুই দেশে সম্প্রদায়ের মধ্যে স্থানান্তরের ঘটনা ঘটে। স্থানান্তরের বড় উদাহরণ হচ্ছে, ইংরেজশাসিত ভারতের বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশে। ভারত হতে পাকিস্তানের উভয় অংশে (পূর্ব ও পশ্চিম) মুসলিমরা, অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান হতে হিন্দুরা ভারতে যায়; আবার পাঞ্জাব হতে মুসলিমরা পশ্চিম পাকিস্তানে এবং পাকিস্তান হতে শিখ সম্প্রদায়ের সদস্যরা ভারতে চলে আসে।

পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান ছিল গোটা পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পশ্চাদপদ। ‘পাকিস্তানের জন্মলগ্নে পূর্ব পাকিস্তানের চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তান সর্বক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে বেশ সচ্ছল ছিল।’১০

পূর্ব পাকিস্তানিরা ছিল বাংলাভাষী। শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি তথা পাঞ্জাবিরা শাসনদণ্ডের কর্তৃত্বের আসনে বসে। দেশের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে তারা উর্দুকে বেছে নেয় এবং পূর্ব বাংলার বাসিন্দাদের উপর বাংলার পরিবর্তে উর্দু চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করে। যাতে বাংলার দামাল ছেলেরা প্রতিবাদমুখর হয়। অবশ্য ১৯৪৭এর আগেই যখন পাকিস্তান রাষ্ট্রের কথা আলোচনা হচ্ছিল, তখুনি ওই রাষ্ট্রের ভাষা উর্দু হবে বলে আলোচনা ওঠে। জ্ঞানতাপস মুহাম্মদ শহিদুল্লাহসহ একাধিকজন তখুনি এর বিরোধিতা করেন এবং বলেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। এই বিষয়ে একাধিক প্রবন্ধ তখনকার পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৪৮ সালে শাসকরা যখন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবনা উত্থাপন করে, তখন তা প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়ে। কিন্তু শাসকেরা নানা কৌশলে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফন্দি আঁটতে শুরু করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে প্রতিবাদ মিছিল করে। সরকারের পুলিশ বাহিনী তাতে গুলিবর্ষণ করে। সালাম, রফিক, জব্বারসহ অনেকেই শহিদ হন।

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের মতে, ‘ভাষা, গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন, ধর্ম ও অর্থনৈতিক বৈষম্য-এই পাঁচ বিষয় ১৯৫০-এর দশকে আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভাষ্যে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। এসব ইস্যু ধারাবাহিকভাবে আমাদের পাকিস্তানি শাসকদের থেকে আলাদা করেছে এবং আমাদের জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের মূল অ্যাজেন্ডা তৈরি করে দিয়েছে।’১১ ভাষাবিজ্ঞানী সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় এই বিষয়েই বলেছেন, ‘ভাষা না হইলে নেশন বা জাতি হয় না, এবং ভাষা সন্মন্ধে সচেতন না হইলে, জাতীয়তাবোধও আসে না।’১২ প্রকৃতপক্ষে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনই প্রথম জাতীয়তাবাদী আন্দোলন; যা কালক্রমে স্বাধিকারের আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়।

বাঙালিদের সাথে পাকিস্তানিদের ভিন্নতর অবস্থানের আরও একটি বিশেষ কারণ হচ্ছে, রাজনীতিতে ধর্মের নিকৃষ্ট ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে অর্থনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা শুধু হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানেই বিশ্বাসী ছিলেন না, বাঙালি-অবাঙালিসহ সব শ্রেণির মানুষকে নিয়ে গঠিত একটি জাতপাতহীন সমাজে বিশ্বাস করতেন। এই বিশ্বাসীরাই ১৯৪৯ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগ দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নামে রাজনৈতিক দলের বিকাশ ঘটান। আওয়ামী লীগ যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেয়। এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়ের দিকে অগ্রসর হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান বলছেন, পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই নৃতাত্ত্বিক-ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে পূর্ব বাংলায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সে আন্দোলন একই সঙ্গে ছিল গণতন্ত্র এবং সুষম অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। ১৯৫০-এর দশক থেকে ১৯৬০-এর দশকে সেই আন্দোলন ক্রমে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। তবে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুই পেরেছিলেন ছয় দফার মাধ্যমে তাঁর স্বায়ত্তশাসনের দাবির পেছনে গোটা বাঙালি জাতিকে এক করতে। তাঁর নেতৃত্বের কারণেই সেদিন এ দেশের সব শ্রেণির মানুষ এক হয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিল। পুরো জাতির এই ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল।১৩ ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি শেখ মুজিব জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বাংলার জনগণের পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন। চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এই পর্যায়ে আসার জন্যে পূর্ব বাংলার প্রধান রাজনৈতিক শ্রোতধারা এবং এর একক নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবির্ভূত হন। এর ধাপে ধাপে ছিল বাংলা ভাষা ও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের সংগ্রাম। একথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, বঙ্গবন্ধু ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানের বিরুদ্ধে, ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

বলাই বাহুল্য যে, বাংলাভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের সবচেয়ে কঠিন সময়টি ছিল ১৯৭১ সাল। বিচ্ছিন্নতাবাদীর তকমা যাতে কোনভাবে পশ্চিম পাকিস্তানিরা দিতে না পারে সেকারণে বঙ্গবন্ধুর কৌশলী পদক্ষেপ এবং অসাম্প্রদায়িকতার শ্লোগানে দেশটির অপরাপর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো দলটির (আওয়ামী লীগ) উপর আস্থা স্থাপন করে। অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এই প্রবণতাটিকেই ভারতের চক্রান্ত বা ভারতপন্থী হিসেবে প্রচার করে। তারা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সংগ্রামকে ভারত তথা হিন্দুদের পাকিস্তান ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করে। ভারত বিরোধিতা এবং হিন্দু বিরোধিতা প্রায় সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ হতে ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ পর্যন্ত লাখ লাখ মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছিল, যাদের একটি বিরাট অংশ ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী; বিশেষত: পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীদের দৌরাত্মে নিপীড়ন-লুটপাটের শিকার হয়ে প্রায় এক কোটি হিন্দু জনগোষ্ঠীকে ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়। ভিটেমাটি হারানোদের লুটের সম্পদে পাকিস্তানি দোসরগণ তাদের সম্পদ গড়ে তোলে। অবশ্য, উনিশশ’ সাতচল্লিশোত্তরকাল হতেই হিন্দুদের দেশান্তরী হওয়া এবং তাদের সম্পত্তি দখল করার একটি প্রবণতা গড়ে উঠেছিল।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই- বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনো ধর্মভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এ দেশের কৃষক-শ্রমিক, হিন্দু-মুসলমান সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে (অসমাপ্ত আত্মজীবনী – শেখ মুজিবুর রহমান পৃ. ১৬৪)।’১৪

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ | ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

৪.

স্বাধীনতার পর ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে সংযোজিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর দেশ পরিচালনার নীতিসমূহ অচিরেই বাধাপ্রাপ্ত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত পাকিস্তানি শক্তি ও তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তির যৌথ ষড়যন্ত্রের ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ভিন্ন ধরনের এক জাতীয়তাবাদের আমদানি করা হয়, যা স্পষ্টত ধর্মভিত্তিক দ্বি-জাতি তত্ত্বে প্রত্যাবর্তনের বিপজ্জনক ইঙ্গিত দেয়। সংবিধান পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের বাঙালিদের পরিচিতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের সূচনা হয়। ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী আনেন। এর মাধ্যমে সংবিধানের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ অপসারণ করা হয়। এই অনুচ্ছেদ দ্বারা সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় পক্ষপাতিত্ব এবং/অথবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্ম বৈষম্য ও ধর্মের অপব্যবহার বিলোপ সাধন করে ধর্মনিরপেক্ষতা বাস্তবায়নের পথ সুগম করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর থেকে সংবিধানকে নানাভাবে কাঁটা-ছেঁড়া করা হয়। ১৯৭৭ সালের মে মাসে সংবিধানের ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার করা হয়। এর ফলে, ধর্মের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গঠন করার পথ সুগম হয়। সংবিধানের ২৫নং অনুচ্ছেদ-এর সঙ্গে একটি নতুন উপ-অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়। যেখানে ‘ইসলামি সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপনের কথা বলা হয়।’ এই উদ্দেশ্যে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেয়া হয়েছিল এবং সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজিত হয়েছিল। আর এরই ধারাবাহিকতায় এইচ এম এরশাদ সরকারের সময় ১৯৮৮ সালের ৭ জুন সংবিধানে অষ্টম সংশোধনী আনা হয়। এতে ‘ইসলাম’কে রাষ্ট্রধর্ম সংযোজন করা হয়। এসবের মধ্যে দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার থামানো এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলাম রাজনীতি করার সুযোগ পায়। অবশ্য, ২০১১ সালের জুন-জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে পাস করা পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা একে পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয়। তবে, রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে ‘ইসলাম’-কে বহাল রাখা হয়, যদিও সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ পুনরায় সংযোজিত হয়েছে।

১৯৯০ সালে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারার রাজনৈতিক পর্ব শুরু হয়। আওয়ামী লীগের ধারণা ছিল তারাই দেশ শাসনের রায় পাবে; কিন্তু তা হয়নি। জনতার রায় আওয়ামী লীগের বিপক্ষে যায়, বিএনপি জয়লাভ করে। এ থেকে আওয়ামী লীগের এই ধারণা তৈরি হয়, ভারতমুখী প্রচারণার কারণে এবং আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ বা ভারতমুখী দল, এ কারণেই ধর্মভীরু মুসলিম জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদেরকে আস্থায় নিতে পারছে না। এর ফলে আওয়ামী লীগ যে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলে, তারা যে ইসলামের অনুসারী, তা প্রমাণের চেষ্টা শুরু হয়। দলীয় কর্মকাণ্ডেও তা প্রতিফলিত হতে শুরু করে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে দলীয় প্রধানের মাথায় কাপড় ও হাতে তসবিহ ধরে রাখা পোস্টার দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সিনিয়র নেতারা বক্তব্য দেয়ার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম’ বলা শুরু করেন। উপরন্তু, আওয়ামী লীগ তার দলীয় গঠনতন্ত্র হতে সমাজতন্ত্র বাদ দিয়ে মিশ্র অর্থনীতির অনুসারী বলে ঘোষণা দেয়। ১৯৯৬এর ১৫ ফেব্রুয়ারি (ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন) ভোটারবিহীন নির্বাচনবিরোধী আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীকে কৌশলগত মিত্র হিসেবে গ্রহণ করা এবং ১৯৯৬এর জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। কারণ, আওয়ামী লীগ তখন ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করেছিল; কিন্তু সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৫১ আসন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতার ওই পর্বে ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে; যার মধ্যে দিয়ে ১৯৭৫এর নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিচার করার পথ সুযোগ হয়। ২০০১এর নির্বাচনে আবারও বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর চার দলীয় জোট ক্ষমতাসীন হয়। ক্ষমতায় আসার পর পরই ব্যাপকভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিশেষত: হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নিপীড়ন চলে।

২০০৯ সালে আবারও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। তারা আজ পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। এ সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকারের সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ উনিশশ’ একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ট্রাইবুনালে বিচার করে দণ্ড প্রদান ও তা কার্যকর করা। অবশ্য, শীর্ষ কয়েকজনকে দণ্ড দিয়েই ট্রাইবুনালের কার্যক্রম অঘোষিতভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে, দারিদ্র্য কমছে। আদালতের রায় বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী হয়েছে। এতে ১৯৭২-এর সংবিধানের প্রায় সকল অনুচ্ছেদ, বিধি-বিধান কার্যকর হয়েছে; তবে রয়ে গিয়েছে রাষ্ট্রধর্ম। রাষ্ট্র পরিচালনার নানা পর্বে ধর্মীয় গোষ্ঠীর সাথে একই সাথে পা মিলিয়ে চলার চেষ্টা চলেছে। এর ফলে সাম্প্রদায়িক শক্তি উসকানি পাচ্ছে।

প্রায়শ:ই দেখা যায়, জমি ও বসতবাড়ি থেকে সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদের জন্য তাদের উপর আক্রমণ করা হয়। মন্দিরের বিগ্রহ ভাঙচুর করা হয়। আগে এসব ঘটনা লুকিয়ে বা আড়ালে-আবডালে করা হলেও এখন অনেক ঘটনাই প্রকাশ্যেই সংঘটিত হয়। দেশে যখনই কোনো রাজনৈতিক সংকট দেখা হয়, তখন হামলা-নিপীড়নের লক্ষ্যবস্তু হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষত: হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। ১৯৯০ সালের শেষ দিকে সেনাশাসক এইচ এম এরশাদকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে প্রবল গণআন্দোলন শুরু হয়। সে সময়ে ভারতের বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অসংখ্য মন্দির ও মঠ আক্রান্ত হয়। সংখ্যালঘুরা শারীরিকভাবে হামলার শিকার হয়। অনেককে দেশত্যাগে বাধ্য করার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। একই ঘটনা আবারও দেখা দেয় ১৯৯২ সালে, ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের আগে ও পরে। ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করতে হামলা-মামলা-নির্যাতন চলতে থাকে। ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ সালের পর এই ২০২১ সালেও দেশের বিভিন্ন স্থানে এর ভয়ঙ্কর রূপ আমরা  দেখতে পাই।

শহীদ বুদ্ধিজীবীর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে সরকার - BBC News  বাংলা

৫.

একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, স্বাধীনতা-পূর্বকালের জাতীয়তাবাদী লড়াইয়ের সময়ে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চা সামান্য হলেও বিকশিত হয়েছিল; মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সেই চর্চা বিন্দুমাত্র আগায়নি, বরং সাম্প্রদায়িকতার চর্চা করা হয়েছে। উনিশশ’ ষাটের দশকে এ ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি আইয়ুব-মোনায়েমের সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির বিরুদ্ধে যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিল, এখন তা যেন কেবলই সুখস্মৃতি। বর্তমানে রাষ্ট্রধর্ম আছে, আবার ধর্মনিরপেক্ষতাও আছে; সর্বোপরি, আমরা অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলি। অসাম্প্রদায়িকতার বুলি এখন কার্যত: বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ কারণে একটি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায়ও অপরাধীদের চিহ্নিত করা বা বিচারের আওতায় আনার উদাহরণ নেই।

সরকারি আদমশুমারি অনুসারে ১৯৪১ সালে মোট জনসংখ্যার শতকরা ২৮ দশমিক ৩০ ভাগ ছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘু। এর মধ্যে এক কোটি ১৮ লাখ হিন্দু, এবং বৌদ্ধ, খ্রিস্টান প্রভৃতি সংখ্যালঘু ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার। অন্যদিকে, ১৯৯১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে মুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেড়েছে শতকরা ২১৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যা বেড়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে ১৯৯১ সালে হিন্দু জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ানোর কথা ৩ কোটি ২৫ লাখে। বাস্তবে এই সংখ্যাটি ১৯৯১ সালে ছিল এক কোটি ২৫ লাখ। এর অর্থ হচ্ছে, জনসংখ্যার মধ্য থেকে দুই কোটি হিন্দু হারিয়ে গেছে। আবার, ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২০ শতাংশ হিন্দু, শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ বৌদ্ধ, এবং শূন্য দশমিক ৩০ ভাগ খ্রিষ্টান। এর পরের ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার শতকরা ৮ দশমিক ৫০ ভাগ হিন্দু, শূন্য দশমিক ৬০ ভাগ বৌদ্ধ, শূন্য দশমিক ৩০ ভাগ খ্রিষ্টান, এবং শূন্য দশমিক ১০ ভাগ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।

দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান তথা ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জীবন, সম্পত্তি ও স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ অব্যাহত আছে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় বাসস্থান চট্টগ্রামের রামুতে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বৌদ্ধ বিহার ভাঙচুর-অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত করে দেওয়া হয়। এই ঘটনারও কোন অপরাধী চিহ্নিত হয়নি। অবাক করার বিষয় হচ্ছে, উনিশশ’ ষাটের দশকে রবীন্দ্রনাথকে বর্জন করার শাসকদের চেষ্টার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদে বাঙালি জাতীয়তাবাদ যেখানে সুসংহত হয়েছিল, সেখানে ২০১৭ সালে প্রকাশিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ৭৮টি বইয়ে সাম্প্রদায়িকতার ছায়া দেখতে পায় বেসরকারি একটি তদন্ত কমিশন (https://www.bbc.com/bengali/news-39230975)।

একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, ১৯৪৭ পূর্বকাল হতেই বাংলায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চা শুরু হয়, যার বিরুদ্ধাচরণের মধ্যে দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন পুষ্ট ও একাত্তরের ৯ মাসের যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতি-রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। বলাইবাহুল্য, এর বৃদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের কাজটি করেছিল এদেশের অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবীরা; এ কারণেই পাকিস্তানি শাসকবর্গের প্রধান শত্রু বিবেচিত হয়েছিল ওইসব নমস্য মানুষেরা – যাঁদেরকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা খুঁজে খুজে হত্যা করে। পাকিস্তানিরা আমাদেরকে মনোজাগতিকভাবে হারিয়ে দিতে চেয়েছিল, আবারও পশ্চাদপদ চিন্তার দিকে আটকে থাকার পরিকল্পনা করেছিল; আজকের পরিবর্তিত বাস্তবতায় মনে হয়, তাদের উদ্দেশ্য যেন খানিকটা হলেও সফল হয়েছে। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় পুষ্ট অসাম্প্রদায়িক-মানবিক যে রাজনৈতিক ধারাটির মধ্যে দিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, তা আমাদের বিকশিত করতেই হবে; এর অন্যথা নেই। আমরা যদি তা না পারি, তাহলে শহিদদের প্রতি আমরা আমাদের যথাযথ সম্মাণ ও উত্তরসূরী হিসেবে অর্পিত দায়িত্ব পালনে সমর্থ হবো না। আমাদের প্রধান কাজ হওয়া উচিত মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক বোধ ও মানবিকতার ধারাটি আরও, আরও চর্চা করা ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তাহলেই শহিদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি আমরা যথাযথ সম্মান দেখাতে পারবো।

  • [১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর আয়োজিত ১৪ ডিসেম্বর ২০২১এর আলোচনা সভায় প্রবন্ধটি উপস্থাপিত।]

তথ্যসূত্র:

১) রোজিনা ইসলাম, “শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞা চূড়ান্ত”, প্রথম আলো, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১।

২) Telegram 978 From the Consulate General in Dacca to the Department of State, March 29, 1971, 1130Z

৩) Dr. Rashid Askari, “Our martyerd intellectuals”, sub-editorial, Daily Star, December 14, 2005

৪) মুনতাসীর মামুন ও মহিউদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত, পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। আইএসবিএন 984-05-0274-3।

৫) ড. এম এ হাসান, যুদ্ধাপরাধ,গণহত্যা ও বিচার অন্বেষণ, ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি, ২০০১  

৬) “125 Slain in Dacca Area, Believed Elite of Bengal”New York Times, 19 December 1971.

৭) পান্না কায়সার, মুক্তিযুদ্ধ: আগে ও পরে, আগামী প্রকাশনী। আইএসবিএন 984-401-004-7

৮) বুদ্ধিজীবী নিধন তদন্ত কমিশন ১৯৭১, প্রফেসর ডঃ সৈয়দ সাজ্জাদ হোসইন

৯) বাংলাদেশগণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত বিজয় দিবস স্মারক গ্রন্থ, ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২; সম্পাদক: সৈয়দ আলী আহসান

১০)  মো: হাবিবউল্লাহ্ বাহার, পাকিস্তানের আঞ্চলিক বৈষম্য, বাংলা একাডেমি, প্রথম পুনর্মুদ্রণ : জুন ২০১৭, পৃ. ৪০

১১) রওনক জাহান, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়,  ২০২০;

১২) জাতি, সংস্কৃতি ও সাহিত্য, পৃ. ১৪; বাঙ্গালীর সংস্কৃতি, কবি প্রকাশনী, ২০১৯

১৩) রওনক জাহান, ২০২০

১৪) শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১২, পৃ. ১৬৪

*লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

Post a comment