Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

গণহত্যা, রাষ্ট্র ও জাদুঘর : যেখানে জড়িয়ে আছে এক গভীর রাজনীতি।। আবুল বাশার নাহিদ

  • আবুল বাশার নাহিদ

ইউরোপীয় সামন্ততান্ত্রিক সমাজের সমাপ্তির পাটাতনে আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোর বিকাশের সূচনা বলা যায়। আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র কাঠামোর চূড়ান্ত বিকাশ আরো কয়েকশত বছর পরের ঘটনা। এই জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র তার কর্তৃত্ব অন্য জাতিগোষ্ঠির উপর প্রতিষ্ঠার জন্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, গণহত্যায় যেমন লিপ্ত হয়েছে তেমনি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ এবং প্রদর্শনের জন্য তৈরি করেছে  জাদুঘরের মত নানান প্রতিষ্ঠান। যদিও গণহত্যা , জাদুঘর বা রাষ্ট্রের ধারণা নতুন হলেও এসব কর্মকাণ্ডের সূচনা বহুত আগের। সেই প্রাচীন গ্রীক- রোমান সভ্যতায় খুঁজে পাওয়া যায় গণহত্যার মত সুসংগঠিত অপরাধ, নগর রাষ্ট্রের বিবরণ আবার জাদুঘরের মত প্রতিষ্ঠান। হয়তো এসব প্রতিষ্ঠানের কাঠামো আধুনিক সময়ের মত এতটা সুসংগঠিত ছিল না বা তার প্রয়োজনই পড়েনি। গত শতকের প্রথম চার দশকেই বিশ্ববাসী দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখেছে। সে যুদ্ধের আগে পরে নির্বিচারে গণহত্যা হয়েছে। পরবর্তী দশকগুলোতে বিশ্বযুদ্ধ না হলেও গণহত্যার শিকার হয়েছিল কয়েক কোটি মানুষ। ২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে যুদ্ধে সংগঠিত গণহত্যার কথা কথা জোরালোভাবে সামনে আসে। বলা যায় মূলত ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই গণহত্যার সংজ্ঞা এবং শাস্তির মাপকাঠি প্রণয়ন করা হয়। গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমানস তৈরির জন্য গড়ে তোলা হয় গণহত্যা জাদুঘর। তবে এই গণহত্যার বিচার এবং এর বিরুদ্ধের জনমানস তৈরির যে প্রকল্প তা রাজনীতির বহির্ভূত কোন বিষয় নয়, বরং কোন ঘটনাকে গণহত্যাকে বলা হবে, আর কোনটাকে বলা হবে না, কোনটাকে আলাপের টেবিলে রাখা হবে, আর কোনটাকে বিস্মৃতির সাগরে ডুবিয়ে দেয়া হবে, সেটা ছিল গত শতক, এবং এমনকি এই শতকেরও একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রপঞ্চ।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। ২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী এত অল্প সময়ে এর বড় গণহত্যা আর সংঘটিত হয়নি। কিন্তু বহু দুনিয়াবি কারণ এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক বিদ্যায়তনিক পরিসর থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি, স্থানিক রাজনীতি দেশের ভেতরে একে এনে দাড় করিয়েছে দলীয় রাজনৈতিক মাঠে; ফলে রাজনৈতিক প্রয়োজনে মতাদর্শিক কারণে গণহত্যার ঘটনাকে প্রথমে নীরবতার চাদরে ঢেকে দেয়া হয়, সেই নীরবতা একসময় নিয়ে যায় ইতিহাস বিকৃতির দিকে।

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বাংলাদেশে গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী; গণহত্যার বিচার নিয়ে যেমন রাজপথে আন্দোলন করেছেন তেমনি তিনি এই গণহত্যার স্মৃতিকে জনমানসে তুলে ধরার জন্য লেখালেখি করেছেন, গণহত্যা জাদুঘরের মতন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন; দুনিয়াব্যাপী গণহত্যা জাদুঘর ঘুরে ঘুরে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন; এমন একজন জনবুদ্ধিজীবী খুঁজে পাওয়া দুরূহ হবে যিনি গণহত্যার ইতিহাসকে তুলে ধরার জন্য দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে সম্ভাব্য সকল প্ল্যাটফর্মে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি তাঁর দীর্ঘ একাডেমিক এবং মাঠে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে লিখেছেন “গণহত্যা, রাষ্ট্র, জাদুঘর: পরিপ্রেক্ষিত একাত্তরের বাংলাদেশ” নামক গ্রন্থ। ১৯৭১: গণহত্যা- নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর থেকে এ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছ।

গ্রন্থে লেখক প্রথমে তত্ত্বীয় কাঠামো আলাপে দেখাতে চেয়েছেন গণহত্যার সূচনা কখন থেকে শুরু হয়েছে এবং রাষ্ট্র কীভাবে গণহত্যাকে ব্যবহার করে তার নিজস্ব স্বার্থে। কীভাবে গণহত্যাকে পুঁজি করে রাষ্ট্র তার নিজস্ব বয়ান তৈরি করে। কীভাবে এই গণহত্যাকে রাষ্ট্র তার নিজস্ব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জাদুঘর গড়ে তুলে। শুধু জাদুঘর তৈরি না বরং এই জাদুঘরে কী কী দেখানো হবে এবং এই জাদুঘর কী ধরনের মানস তৈরি করবে তা নির্ধারণ করে দেয় রাষ্ট্র। গণহত্যা বা জাদুঘরের মধ্য দিয়ে কীভাবে আধিপত্যবাদী বয়ান তৈরি করে তিনি কেবল সে আলাপই তুলে ধরেননি বরং পাশ্চত্য ঐতিহাসিকরা কিভাবে তাদের  নিজদেশে সংঘটিত অপরাধগুলো গোপন করে, অন্ধকার জগতকে আড়াল করে নিজেদের মহান এবং আলোকিত হিসেবে উপস্থাপন করে সেগুলোও তুলে ধরেছেন। তিনি দেখান কিভাবে ভলতেয়ারের বর্ণবাদী রুপকে আড়াল করে শুধু হিরো হিসেবে অথবা মার্কিন স্বাধীনতার ঘোষণার রচয়িতা থমাস জেফারসনকে শুধু মহান হিসেবে দেখানো হচ্ছে জাদুঘরে; অথচ তিনি যে দাস মালিক ছিলেন তার কোন উল্লেখ নেই। তার অর্থ হলো জাদুঘরের একটা রাজনীতি আছে। লেখক তার আলাপের  শুরুতে  আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। প্রথমত গণহত্যাকারীরা গণহত্যার প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য একটা তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেন যেখানে প্রথমে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ গণহত্যার অনুকূল প্রভাবলায়ে আনেন তারপর বিদেশি শক্তির জোরালো প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ বন্ধের ব্যবস্থা করেন। লেখক উদাহরণ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে রোহিজ্ঞা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার কথা উল্লেখ করেন। দ্বিতীয়ত শাসকের গণহত্যার বিরুদ্ধে সিভিল সমাজকে ভূমিকা রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে ব্যতয় ঘটলে তাদেরকেও দায় নিতে হবে এবং পরবর্তী পরিস্থিতি প্রতিকূলেই চলে যায়। যেমন ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানি সিভিল সমাজ শাসকদের গনহত্যাকে সমর্থন করেছিল যার ফলাফল পাকিস্তানকে জঙ্গিবাদী রাষ্ট্রে রুপান্তর অথবা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যাকে অং সান সুচির রাজনৈতিক সমর্থন এবং সিভিল সমাজের ভূমিকা পরবর্তী ফলাফল খুবই নেতিবাচক ছিল।

May be an image of one or more people and text that says 'Muntassir Mamoon Genocide, State and Museum A Study on the Bangladesh of 1971 DACC GA-39'

মূল বইয়ের ইংরেজি সংস্করণ

তিনি দেখিয়েছেন বিশ্ব ক্ষমতাসীনরা গণহত্যার বিচারকে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার করে থাকে। ২য় বিশ্ব যুদ্ধের পরে জার্মানির নাজি বা হিটলারের বিচার হয়েছে এবং এ বিষয়কে জনমানসে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। কিন্তু ২য় বিশ্বযুদ্ধে শুধু ইহুদীরাই মারা যায়নি বরং নাজির কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে হত্যার শিকার হয়েছে যেমন লালফৌজের সৈন্য, তেমনি বহু মতাদর্শের মানুষ। কিন্তু মার্কিন বা ইউরোপীয় বয়ানে তাদের স্মৃতি ফুটে উঠে না। এর পিছনে রাজনীতিটাই কাজ করছে। কারণ সোভিয়েত এর আদর্শ তাদের বিরোধী। তেমনি গত শতকের ষাটের দশকে ইন্দোনেশিয়ার সামরিক শাসক সুহার্তো আমেরিকার সহায়তায় এক লক্ষ কমিউনিষ্ট ও ভিন্ন মতালম্বীদের হত্যা করেছেন। এর বিরুদ্ধে কোন বিচার হয়নি। লেখক দেখাতে চেয়েছেন একটি গণহত্যার পিছনে কিভাবে স্বার্থের রাজনীতি কাজ করে।

লেখক এরপর দেখিয়েছেন জাদুঘর কিভাবে গড়ে উঠে। এই জাদুঘর কিভাবে গণহত্যার স্মৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌছে দেন। তবে লেখক সতর্কতার সাথে পাঠকদের স্মরণ করে দিয়েছেন জাদুঘরের পিছনে কীভাবে রাজনৈতিক প্রকল্প কাজ করে। তিনি দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে কিভাবে গণহত্যা জাদুঘর গড়ে উঠেছে তার বিবরণ দিয়েছেন। এই বিবরণ একটা কারণে ব্যতিক্রমী বটে কারণ লেখক নিজে এসব জাদুঘর পর্যবেক্ষণ করে এসেছেন। ফলে তার বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। পাঠকদের জন্য স্মরণ রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে বাংলদেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গড়ে উঠা দুটি জাদুঘরে লেখক সরাসরি জড়িত। ফলে তিনি যখন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আর গণহত্যা জাদুঘর তৈরির বর্ণ্না দিচ্ছেন তা শুধু একটি জাদুঘর নির্মাণের গল্পে আঁটকে থাকছে না বরং তা ছাপিয়ে রাষ্ট্রের শাসকদের চরিত্র- মনোভাব, আমলাদের ভূমিকা,  সিভিল সমাজের ভূমিকা এবং সাধারণ জনগণের অসামান্য সহযোগিতার  রুপরেখার দলিল হিসেবে পেশ হয়। ত্রিশ লক্ষ শহিদ, পাঁচ লক্ষ নারীর ধর্ষণ, আর লক্ষ মানুষের পঙ্গুত্ব, যুদ্ধে বিধস্ত দেশে কীভাবে গণহত্যাকে অস্বীকার করা হয় এবং তাদের স্মৃতি দৃশ্যপট থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা এবং এর বিরুদ্ধে স্মৃতিকে মানস জগতে তুলে আনতে বাধার সম্মুখিন হতে হয় তার বর্ণনা পাওয়া যাবে এ গ্রন্থে। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘরের ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহীদের জন্য এই বইটি হবে তথ্যবহুল ধারাভাষ্য।

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ‘১৯৭১ : গণহত্যা- নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’ গড়ে তুললে এক শ্রেনীর মানুষ এটাকে রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে অভিযোগ তুলতে থাকল। এ গ্রন্থটি তাদের এসকল অভিযোগের একটি জবাব বলা যেতে পারে যেখানে তিনি দেখিয়েছেন গণহত্যা, রাষ্ট্র, জাদুঘর কিভাবে কাজ করে। তিনি দেখিয়েছেন বাংলাদেশ যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ত্রিশ লক্ষ মানুষ শহিদ, বিপুল ক্ষয়ক্ষতিকে কীভাবে স্বাধীনতা বিরোধী অভ্যন্তরীণ এবং বাইরের শত্রু স্মৃতি থেকে ভুলিয়ে রাখতে চায়। তিনি দেখিয়েছেন এ গণহত্যাকে কেন জনমানসের স্মৃতিতে ধরে রাখা জরুরী। তিনি একটা বিষয়ে স্পষ্ট করেছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কারা রাজনীতি করতে চায় আর কারা পাকিস্তানি গণহত্যাকে ভুলিয়ে বাংলাদেশে পাকিস্তানি মানস তৈরি করতে চায়।

গণহত্যা, রাষ্ট্র ও জাদুঘর : পরিপ্রেক্ষিত একাত্তরের বাংলাদেশ
মুনতাসীর মামুন
প্রকাশকাল: ২০২১
গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র, ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট, খুলনা 

Post a comment