Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

ইতিহাসটাকে আমি সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছি

[সম্পাদকীয় নোট: প্রখ্যাত শিল্পী হাশেম খানের সঙ্গে ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের এই আলাপচারিতা গৃহীত হয়েছিল ২০১১ সালের ২১ মে। তাদের দুজনের পাশাপাশি আরো বহুজন সেদিন উপস্থিত ছিলেন। দুজনের আলাপচারিতা থেকে মুনতাসীর মামুনের বেড়ে ওঠা, সৃজনশীল তৎপরতা, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের একটা চিত্র পাওয়া যায়। এগুলোকে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিবেচনা করে মুনতাসীর মামুনের এবারের জন্মদিন উপলক্ষ্যে পুনঃপ্রকাশ করা হলো। সাক্ষাতকারটি নেয়া হয়েছে মামুন সিদ্দিকী সম্পাদিত ‘ঐতিহাসিকের মানসজগৎ: মুনতাসীর মামুনের সাক্ষাৎকারগুচ্ছ’ শীর্ষক গ্রন্থ (২০২১) থেকে নেয়া হয়েছে।]  

শুরু করেছিলেন শিশুসাহিত্য দিয়ে। একসময় সাংবাদিকতাও করেছেন। এখন শিক্ষকতা করছেন এবং প্রায় চার দশক ধরে উনিশ ও বিশ শতকের বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসন ও সিভিল সমাজ নিয়ে নানান হন লেখার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিষয়ক লেখালেখিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। ছাত্রজীবন থেকে সর্বদাই যুক্ত থেকেছেন যাবতীয় আন্দোলন-সংগ্রামে। মুনতাসীর মামনের জন্মদিনকে সামনে রেখে আমাদের এই বিশেষ আয়োজন।

হাশেম খান : রাজীব নূর তুমিই বরং আমরা কেননা এখানে এলাম সে উদ্দেশ্যটা একটু ব্যাখ্যা করে বলো।

রাজীব নূর : আমরা মুনতাসীর মামুনের ষাটতম জন্মদিনকে সামনে রেখে মুনতাসীর মামুনের সঙ্গে হাশেম খানের আলাপচারিতার উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে মিলিত হয়েছি। অন্য যারা এখানে রয়েছেন, তাদের মধ্যে আমি নিজে, কিংবা জাহাঙ্গীর ভাই (আহমেদ মাহফুজুল হক, সুবর্ণ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী), কিংবা সেলিম ভাই (মোহাম্মদ সেলিম, শিক্ষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়), জনি (শরাফত হোসেন, তরুণ লেখক), প্রাঞ্জল (প্রাঞ্জল সেলিম, আলোকচিত্রী) মাঝেমধ্যে সূত্রধরের ভূমিকা পালন করতে পারি। কিন্তু এ আলাপচারিতায় মুখ্য ভূমিকাটা থাকবে হাশেম খানের। আর হাশেম স্যারের কাছে আমাদের চাওয়াটা হচ্ছে তিনি লেখালেখি, অধ্যাপনা, আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত মুনতাসীর মামুনের পাশাপাশি ব্যক্তি মুনতাসীর মামুনকেও তুলে আনবেন।

হাশেম খান : ঠিক আছে আমি সেই চেষ্টা করব। কিন্তু তোমরা কেউ একজন শুরুটা করো। রাজীব তুমিই প্রথম প্রশ্ন করার সুযোগটা নিতে পারো।

রাজিব নূর : মুনতাসীর স্যার কি ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ দিয়ে শুরু করবেন?

মুনতাসীর মামুন : ছেলেবেলা দিয়ে কী হবে? আমরা লেখার জগৎ নিয়ে কথা শুরু করি।

রাজিব নূর : তাহলে সেই সময়কার কথা বলুন যখন চট্টগ্রামের স্কুলপড়ুয়া একটি ছেলে গল্প লিখে পুরো পাকিস্তানের মধ্যে সেরা হয়ে গেল, পেল প্রেসিডেন্ট এ্যাওয়ার্ড। অবশ্য আপনি সাংবাদিকতা শুরুর সময়টার কথাও বলতে পারেন। সমালোচনা শুরু করেছিলেন সেই সব কথাও শুনতে পারি আমরা।

মনতাসীর মামুন : আমার সাংবাদিকতার শুরু বিচিত্রা দিয়ে। সাংবাদিক আগেই আমার প্রথম বই প্রকাশ হয়েছিল, ওই বইটাতে প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার গল্পটার সাথে আরো কয়েকটি গল্পও ছিল।

হাশেম খান : মুনতাসীরের সাথে দেখা হওয়ার আগেই আমি মুনতাসীরের কথা জানতাম, বিশেষ করে যে কিনা নিজেই শিশুবেলায় শিশুসাহিত্যিক বলে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল। তখনো মুনতাসীর চট্টগ্রামেই আছে। আমার যতদূর মনে পড়ছে আইন খানের সময় ছোটদের লেখালেখি ও আঁকাআঁকির জন্য যখন প্রেসিডেন্ট এ্যাওয়ার্ড ঘোষিত হলো তখন প্রথমবারের মতো পুরস্কার পেল মলয় কুমার ভৌমিক। তারপরে বারই পুরস্কৃত হলেন মুনতাসীর। তবে তার সাথে সাক্ষাৎ হলো এই ঘটনার অনেক পরে। যখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য ঢাকায় চলে এলেন তখনকার ঘটনা সেটা। একটু আগে মুনতাসীর যে বইটার প্রচ্ছদ করার কথা বললেন, ওই বইয়ের প্রচ্ছদ করতে গিয়ে পরিচয় ঘটেছিল আমাদের।

মুনতাসীর মামুন : আমি ১৯৬৮ সালে ঢাকায় চলে আসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ভর্তি হই তখন প্রথম যিনি আমার সঙ্গে যেচে আলাপ করতে এসেছিলেন তিনি হলেন আহমদ ছফা। ছফা ভাই বললেন, আমি তোমার লেখা পড়েছি, তোমার নাম শুনেছি। আমার মনে হয় আমার চাচা বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, যিনি তার কাছে ছিলেন শিক্ষকতুল্য তাঁর কাছ থেকেই আহমদ ছফা আমার নাম শুনেছিলেন। রাজীব তোমাদের কারো কি মনে আছে যে ছফা ভাই ‘নিহত নক্ষত্র’ নামে যে উপন্যাসটি লিখেছিলেন তার নায়কের নাম মুনতাসীর। সে সময়ে এরকম একটা নাম খুব অপ্রচলিত ছিল। মজার ব্যাপার হলো পরে সেলিম আল দীন যখন ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসি’ লিখছে তখন হঠাত্র একদিন আমাকে বলল আমি ফ্যান্টাসির সঙ্গে আরেকটা ওয়ার্ড মেলাতে পারছি না, তোমার নামটা আমার পছন্দ হয়েছে, এটা ব্যবহার করি। আমি বললাম করো। হয়ে গেল সেলিমের ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসি’।

হাশেম খান : মুনতাসীর আপনি যে বললেন বইয়ের প্রচ্ছদ করতে এসে আপনার সাথে আমার পরিচয় হলো এটা বোধ হয় ঠিক না, তার আগেই আমি আপনাদের, মানে আপনাকে এবং আপনার বন্ধু শাহরিয়ার কবির ও আলী ইমামকে চিনতাম। রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই তখন কচিকাঁচার মেলা করতেন, তখনই আপনাদের এই ত্রিমূর্তির দেখা পাই আমি।

মুনতাসীর মামুন : ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়ে গেছে, আমরা তখন মূলত শিশু-কিশোরদের জন্য লিখছি। আমি দাদাভাইয়ের কাছে যেতাম মূলত কচিকাঁচায় লেখা দেওয়ার জন্য। ফলে হাশেম ভাই বা অন্য যারা ছিলেন অর্গানাইজার তাদের সঙ্গে দেখা হতো না। দাদাভাইয়ের কাছে লেখা দিতে গিয়েই শাহরিয়ার কবিরের সঙ্গে পরিচয় হয় আমার। পরবর্তীকালে শাহরিয়ার কবির, আলী ইমাম ও আমি আমরা তিনজন মিলে কিন্তু প্রচুর লেখালেখি করেছি। এবং একেবারে শীর্ষে ছিলাম কিন্তু আমরা তিন জনই, আমার স্থান হয়তো তিন জনের মধ্যে তৃতীয় ছিল।

হাশেম খান : কিন্তু আমি সেই ১৯৭২ সাল থেকে আপনাকে দেখছি শিশুসাহিত্যের পাশাপাশি একটু ব্যতিক্রমী লেখার দিকে আগ্রহ দেখাতে, ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন বলেই হয় পর্ববঙ্গের ইতিহাস, উনিশ শতকের ঢাকা শহর ইত্যাদি নানান বিষয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়তেন। এমনকি, বুড়িগঙ্গা যে বিপন্ন হয়ে পড়ছে, সে নিয়ে সত্তরের দশকেই আপনি রিপোর্ট করলেন, আন্দোলনে নামলেন এবং আমাদেরকেও টেনে আনলেন। মুনতাসীর আপনি শুধুই শিশুসাহিত্য নিয়ে লেগে থাকেননি, শাহরিয়ার কবিরও না, সেই তুলনায় আলী ইমাম অনেক বেশি লেগে আছেন, যদিও টেলিভিশনের চাকরিবাকরিসহ নানান কাজ তাকেও করতে হয়েছে। কাজেই শুধু শিশুসাহিত্য নিয়ে লেগে থাকলে আপনাদের মধ্যে কে প্রথম, কে দ্বিতীয় আর কে তৃতীয় হতেন, সেটা সময়ই বলে দিত। তবে শাহরিয়ারের শিশুসাহিত্য আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল।

মুনতাসীর মামুন : আমি এখনো শিশুসাহিত্য করার চেষ্টা করি, তবে সে তুলনায় ইতিহাস নিয়ে অনেক বেশি কাজে লেগে পড়লাম কেন তা খানিকক্ষণ পরে ব্যাখ্যা করব। বরং শাহরিয়ারের কথাই বলি, শাহরিয়ার যে সবকিছু ছেড়ে এতদিন ধরে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি আঁকড়ে পড়ে রইল, প্রায় একার চেষ্টায় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিকে বাঁচিয়ে রাখল, সে জন্য তো আমাদের পুরো জাতির ওর কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কয়েকদিন আগেও তো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিকে সবাই হাস্যকর বলত। আমার খেয়াল আছে যখন আমরা এটা নিয়ে আন্দোলন করি অনেকেই উপহাস করেছে-আমরা তিন চারজন লোক এটা নিয়ে আঁকড়ে থেকেছি, পেছনে অনেকেরই সমর্থন ছিল, মাঝে কিন্তু ছিলেন গুটিকয়েক জন ।

হাশেম খান : আচ্ছা মুনতাসীর আমরা তো মাত্র কিছুক্ষণ আগে জাহানারা ইমামের জন্মদিনের অনুষ্ঠান থেকে এলাম। সেখানে আপনি আপনার বক্তব্যে বাংলাদেশে আজকে যেসব আমাদের সংকট বিদ্যমান সেগুলো তুলে ধরেছেন, বলেছেন আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি সরকারকে নির্বাচিত করেছি তাদের মনেও নানা প্রশ্নের জন্ম হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার তারা শুরু করেছেন এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, কিন্তু এগুলোর পরিণতি হবে এ নিয়ে আমাদেরকে সংশয়মুক্ত করতে পারেননি। আপনি খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন তাদের কেউ কেউ এখনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড লালন-পালন করছেন। পুলিশ মৌলবাদীদের ধরছে, ধরছে সন্ত্রাসীদেরও আবার ছেড়ে দিচ্ছে। আপনি তাদের সাবধান করে দিয়েছেন, অনেক দিক নির্দেশনামূলক পরামর্শও পয়েছেন। ওখানে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, নিশ্চয়ই অন্যান্য মাধ্যমেও আপনার কথাগুলো সরকারের সবার কাছে পৌঁছে যাবে। আপনার কাছে আমার প্রশ্ন হচ্ছে আপনি কি মনে করেন যে আমাদের এই সব কথা অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা নেবেন?

মনতাসীর মামুন : না হাশেম ভাই, আমার মনে হয় না যে, তারা এ বিষয়গুলো বেশি একটা কর্ণপাত করবে। স্টাবলিশমেন্টের কতগুলো ব্যাপার আমি সব করেছি, যখন যারা মন্ত্রী হয়ে যান, অথবা মন্ত্রী না হয়েও যারা নীতিনির্ধক পেয়ে যান, তাদের সবাই আমলাতন্ত্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। করেন ক্ষমতায় থাকতে আমলাতন্ত্রই তাদের সহায়তা করবে। এ ধারণাটা হল, এবং ঔপনিবেশিক আমল থেকেই এমনটা হয়েছে বলে আমার ধারণা। সেই ঔপনিবেশিক আমলের এসপি, ডিসি পদগুলি আছে সেগুলি এখনো আমরা পরম পূজনীয় বলে ভেবে আসছি। এখন পর্যন্ত আমরা ওই বিষয়টা থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি।

হাশেম খান : এখনো কোনো অনুষ্ঠান হলে দেখা যায় আমরা যারা অধ্যাপনার সঙ্গে জড়িত কিংবা শিল্পসাহিত্য নিয়ে কাজ করি তারা যে সব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকব বলে সম্মতি দিই, আমি দেখেছি সেই সব অনুষ্ঠানেই আমাদের তুলনায় অজ্ঞাতকুলশীল কোনো একজন যুগ্মসচিবও যদি আসেন তাকেই করা হয় প্রধান অতিথি।

মুনতাসীর মামুন : আমি প্রায়শই দেখেছি ওই সব প্রধান অতিথিরা দেরি করেই আসেন অনুষ্ঠানে …।

হাশেম খান : এবং তারা আসবেন বলে আয়োজকরা অধীর হয়ে অপেক্ষা করেন ।

চট্টগ্রাম বেতারে নাটকে অংশগ্রহণ; সকলের সাথে প্রয়াত সাংবাদিক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর ও মুনতাসীর মামুন, ১৯৬৭

মুনতাসীর মামুন : এটা আমাদের আমলাতন্ত্র নির্ভর দাস মানসিকতার ঐতিহাসিক লিগ্যাসি । এটা থেকে আরো কীভাবে মুক্তি পাব জানি না। আর আমাদের মন্ত্রীরা যাদের বেশির ভাগই আমলাদের ওপর দায়দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে বসে থাকেন। আবার দেখুন কারা মন্ত্রী হচ্ছেন? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যারা দক্ষ, যাদের জানাশোনা ভালো, তারা কিন্তু মন্ত্রিত্ব পান না। এই কথাটা বিগত সরকারের প্রত্যেকটির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যিনি প্রধানমন্ত্রী হন তিনি চান না ওই রকম জানাশোনা জবরদস্ত কয়েকজন মন্ত্রী তার অধীনে থাকুক। সবাই তো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান না। ব্যাপারটা আমাদের বুঝতে হবে।

হাশেম খান : আমাদের ভেভর এক ধরনের মানসিকতা ঢুকে গেছে আমরা যে ক্ষমতায় গেলে বা চেয়ারে বসতে পারলে যারা নিয়ে গেছেন তাদের কথা মনে থাকে না। তারাও সে ব্যাপারে সচেতন না।

মুনতাসীর মামুন : এটা কিন্তু এখনো দেখা যাচ্ছে। যারা মন্ত্রিসভায় আছেন তাদের কয়জন রাস্তায় ছিলেন? বা যারা রাস্তায় ছিলেন তাদের কয়জন প্রধানমন্ত্রীর সাথে বিদেশ যাচ্ছেন?

হাশেম খান : আপনার সঙ্গে আমিও একমত। তবু বলতে হবে যে-যতখানি পারি ক্ষমতাসীনদের এই সংস্কৃতিটা বদলানোর চেষ্টা করে যেতে হবে। বলতে বলতেই হয়তো আমরা আমাদের কাজকে এগিয়ে নিতে পারব।

মুনতাসীর মামুন : এই কারণে তো আমরা লিখছি, বলছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতেই হবে এবং সরকারি কিছু উদ্যোগ দেখে আমাদের থেমে গেলে চলবে না-এ দাবিতে পরিচালিত আন্দোলনটিতে ধরে রাখতে হবে।

হাশেম খান : জামায়াতে ইসলামির যে চরিত্র সেগুলো উন্মোচন করতে হবে। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো দায়মুক্তি হয় না, হতে পারে না।

মুনতাসীর মামুন : হাশেম ভাই, দায়মুক্তির এই সংস্কৃতিটা বিএনপির আমল থেকে শুরু হয়েছে। এটার বিরুদ্ধে আমরা বলতে বলতে, লিখতে লিখতে আজকে কিন্তু আমরা কিছুটা হলেও বিজয় ছিনিয়ে আনতে পেরেছি। আমরা আশাবাদী এই কারণে যে মানুষ সচেতন হচ্ছে। আমলাতন্ত্র আগের মতো মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। মানুষ সরকারের ওপর কম নির্ভরশীল। সরকারের ওপর কেউ আছে না আছে আমাদের এখন কেয়ার না করলেও চলে। ফলে আস্তে আস্তে যদি আমরা এগোতে থাকি আমরা একটা লক্ষ্যে অবশ্যই পৌছাতে পারব।

হাশেম খান : আমরা দেখেছি যে, স্বাধীনতার পর সেই ১৯৭২ সাল থেকে রাষ্ট্রীয় বা অন্য যে কোনো ক্ষেত্রে যেসব বৈষম্য, অনাচার হয়েছে তখন আপনার মতো একেবারেই তরুণ একজন প্রতিবাদ করে আসছেন। যে বিষয়ের দিকে কেউ যায় না, যে সব কথা কেউ বলে না আপনি সেই সব বলতে একটু দ্বিধা করেননি। হয়তো বিরূপ সমালোচনাও হতে পারে এমনটি জানা থাকার পরও আপনি নির্বিকারভাবে নিজের কথা বলে যাচ্ছেন।

মুনতাসীর মামুন : তখন কিন্তু আমি ডাকসুর নির্বাচিত সম্পাদক, আসলে আমার বন্ধুভাগ্য ছিল ভালো, তারাই আমাকে শিখিয়েছেন দৈবদুর্বিপাকে কীভাবে রুখে দাঁড়াতে হয়। আজকের বিখ্যাত সম্পাদক মাহফুজ আনাম আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের তুখোড় বক্তা ও বিতার্কিক, আমরা একসঙ্গে ছাত্র ইউনিয়ন করতাম, আলী ইমাম আমার সামনে বইয়ের জগতের একটা নতুন দিক দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। শাহরিয়ার কবির লেখালেখি-সাংবাদিকতার অন্য জগতে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে আমাকে। আমি যখন হাশেম খান আর রফিকুন নবীর মতো তারকা বনে যাওয়া শিল্পীদের সান্নিধ্যে যাই তারা আমাকে কাছে টেনে নেন, তাঁরা ছিলেন আমার চাচা বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের স্নেহভাজন, কাজেই তারা আমাকে গভীর স্নেহে কাছে টেনে নিলেন। আমার চাচার বন্ধুদের অনেকেই ছিলেন আমার শিক্ষক। তাদের মাধ্যমে শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে। তখন আমি ডাকসুর সম্পাদক আবার সংস্কৃতি সংসদের সভাপতিও। আমার সম্পাদনায় বের হয়েছিল ডাকসর মুখপত্র ছাত্রবার্তা। আমাদের জন্য কলাভবনে ডাকসুর ভাইস প্রেসিডেন্ট মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, জয়েন্ট সেক্রেটারি মাহবুব জামান ও আমার জন্য তিনটি রুম বরাদ্ধ করা হয়েছিল।

হাশেম খান : তখন তো আপনি সাংবাদিকতা করছেন, শিক্ষকতায় এলেন কেন?

মুনতাসীর মামুন : ১৯৭৪ সালের দিকে মনে হলো সাংবাদিকতায় থাকব না শিক্ষকতা করব। আমাদের পরিবারটা তো শিক্ষক পরিবার। আমার দাদা শিক্ষক ছিলেন সারাজীবন শিক্ষকতা করেছেন।

হাশেম খান : এখানে একটু বলে নেওয়া ভালো যে, আমার ছোটবেলায় চাঁদপুরে থাকার সময়েই মুনতাসীরের দাদার কথা শুনেছি। আমার আব্বা বলতেন যে হেড মাস্টারের মতো যদি ১০ জন মানুষ দেশে থাকত তাহলে দেশটাই অন্যরকম হয়ে যেত। অনেক পরে মুনতাসীর মামুনের সঙ্গে আমার যখন পরিচয় হলো ত শুনলাম যে আশেক আলী হেডমাস্টার তার দাদা, আমার কাছে মনে হলো বিস্ময়কর পরিচয়।

মুনতাসীর মামুন : দাদার মতো আমার বাবাও শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শত করেছিলেন। আমার চাচারা বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, মহীউদ্দিন খান আলমগীর শামসুল আরেফিন সবাই শিক্ষকতা করছেন তখন। তাদের অনুপ্রেরণাতেই তো আমি বিকশিত হয়েছি, আমাদের পরিবারে বিরাট বইয়ের সংগ্রহ ছিল। সেটা একটা ব্যাপার। আমি ছোটবেলা থেকে দেখেছি বই। আমার বাবা বই কিনছেন, বই বিলাচ্ছেন, বই পড়ছেন, বই সাজিয়ে রাখছেন। আমার চাচা বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর যখন চট্টগ্রামে আসেন, তখন অনেক উপহার নিয়ে আসতেন, সেগুলোর সবই ছিল বই। আমিই তাদের পরিবারের মধ্যে সবার বড় ছেলে, আমার জন্য চাচাদের ভালোবাসাটা তাই সবসময়ই একটু বেশি ছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে, তখন আমি ফাইভ কী সিক্সে পড়ি বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর আমার জন্য নিয়ে এলেন অবনীন্দ্রনাথের ‘মাসি’। এই যে ব্যাপারগুলি-এগুলোই আমার একটা মানস জগত গড়ে তুলেছে, আমাকে লেখালেখি করিয়েছে, শিক্ষকতায় প্রণোদিত হয়েছি আমি। আমার লেখালেখির ব্যাপারে আমার বাবা সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছেন, তবে সেটা শুরুর দিককার কথা, পরে কিন্তু বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের হাতে আমার বিকাশ। দাদা ছিলেন শিক্ষক এবং বোধ হয় তার ছেলেরাও শিক্ষকতায় যুক্ত হোক সেটা চাইতেন তিনি।

হাশেম খান : আপনার দাদা ছিলেন চাঁদপুর অঞ্চলের প্রথম গ্র্যাজুয়েট?

মুনতাসীর মামুন : চাঁদপুরে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম গ্র্যাজুয়েট ছিলেন তিনি, বোধ হয় ১৯১৭ সালের কথা তিনি গ্র্যাজুয়েশন লাভ করলেন। তিনি সারাজীবন স্কুলে চাকরি করেছেন। স্কুল গড়েছেন এবং আমাদের সমস্ত কিছু কিন্তু এভাবেই তিনি দান করে দিয়ে গেছেন। আমাদের পরিবারটি ছিল দরিদ্র পরিবার। আমার বাবা-চাচা এরা খুব সংগ্রাম করে পড়াশোনা করেছেন। নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের সংগ্রামের ফলে একটা সময়ে আমরা একটু স্বচ্ছলতা দেখেছি। আমি পড়াশোনা করেছি বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের বাসায় থেকে, চাচার ওপর চাপ কমাবার জন্যও লেখালেখিতে মনোযোগী হতে হয়েছিল।

হাশেম খানের ছবি

হাশেম খান : এইখানে আমি বলি একটা সময় ছিল যখন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ছিলেন শিল্পকলা আলোচনা ও সমালোচনার একেবারে প্রাণপুরুষ। তিনি নিষ্ঠার সাথে শিল্প নিয়ে আলোচনা করতেন। শিল্পবোদ্ধাদের কাছে যেমন প্রিয় ছিলেন, তেমনি আবার জনসাধারণের কাছে শিল্পকলাকে তুলে ধরার খেত্রেও ছিলেন অগ্রদূত।

আহমেদ মাহফুজুল হক : এই যে পারিবারিক ঐতিহ্য, এটাই বোধ হয় মুনতাসীর মামুনের মনে শিল্পকর্ম সংগ্রহের প্রেরণা তৈরি করেছিল। আমরা জানি তার কাছে রয়েছে শিল্পকর্মের সংগ্রহ। পয়সা তো অনেকেরই ছিল, অথচ মুনতাসীর মামুনের যখন অনটন ছিল তখনো তিনি একের পর ছবি কিনেছেন।

হাশেম খান : একবার হলো কী একটা প্রদর্শনী থেকে ৭০ টাকায় সফিউদ্দিন আহমেদের দুটি ছবি কিনলেন এবং আমাকে ৫০ টাকা দিয়ে একটি ছবি কিনে রাখতে অনুরোধ করলেন।

মুনতাসীর মামুন : ৫০ টাকা দামের ওই ছবিটা ছিল জয়নুল আবেদিনের।

হাশেম খান : আমি কিন্তু তখন জানতাম না মুনতাসীর ওই ছবিটা কিনতে চেয়েছিল এবং পকেটে আর টাকা নেই বলেই ছবিটা আমাকে দিয়ে কিনেছিলেন। অনেক কাল পরে মুনতাসীর আমাকে আক্ষেপ করে বলেছে তখন তার কাছে আর টাকা ছিল না। তিনি যদি আমার কাছে ওই টাকাটা চাইতেন, অথবা ছবিটা কিনে দিতে বলতেন আমি দিয়েও দিতাম নিশ্চয়ই।

মুনতাসীর মামুন : আমি কিন্তু আগেই বলেছি আমার দাদা দরিদ্র কিন্তু দানশীল মানুষ। আমরা কিছুটা টাকা-পয়সা রোজগার করেছি, তাও কিন্তু নিজেকে উচ্চমধ্যবিত্ত বলে দাবি করার মতন না। তবে আমার কাছে অনেক বই আছে…

মোহাম্মদ সেলিম : স্যারের সংগ্রহে এমন বিচিত্র সব বই রয়েছে যা কোনো লাইব্রেরিতে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

রাজীব নূর : আমি যতদূর জানি মুনতাসীর স্যারের পেইন্টিংসের সংগ্রহটাও অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

মুনতাসীর মামুন : আমি এই কথাটা বলতে চাইছিলাম, আমার কাছে বই ও ছবির উল্লেখ করার মতো একটা সংগ্রহ রয়েছে। আমি এগুলো দান করে দিয়ে যেতে চাই। কিন্তু সেই জন্য একটা জায়গা দরকার।

আহমেদ মাহফুজুল হক : জায়গাটা ঢাকা শহরের ভেতরেই হওয়া দরকার।

মুনতাসীর মামুন : ঢাকার আশপাশ হলেও হতে পারে।

হাশেম খান : মুনতাসীর আমাকে নিয়ে ঢাকার আশপাশে এমন একটা জায়গা কেনারও চেষ্টা করেছেন, তবে চেষ্টা তার একক সামর্থ্যে সম্ভব না। আমার মনে হয়, আমরা এখান থেকেই সরকারের কাছে এই আবেদনটা জানিয়ে রাখতে পারি ।

মুনতাসীর মামুন : আমার মনে হয় না হাশেম ভাইয়ের এই আবেদনে সরকারের কেউ কান দেবে।

হাশেম খান : বিত্তবানদের কেউ, বা অনেকজনও একসঙ্গে এই আবেদনটাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে পারেন।

মুনতাসীর মামুন : আশা করতে ইচ্ছে করছে যে আমার হয়ে আপনি যে আবেদন জানালেন তাতে কেউ সাড়া দেবেন।

হাশেম খান : একজন মানুষ তার সারাজীবনের সঞ্চয়, যেগুলোর আর্থিক মূল্য কোটি টাকা, সেগুলো নিজের সন্তানদের জন্য না রেখে সবার জন্য দিয়ে যেতে চান, সেজন্য একখণ্ড জায়গাও পাওয়া যাবে না। আমরা কি এমনই দুর্ভাগা?

রাজীব নূর : হাশেম স্যারকে একটু মনে করিয়ে দিতে চাই, মুনতাসীর সার সাংবাদিকতা নাকি অধ্যাপনা কোনটা বেছে নেবেন এ নিয়ে কিছু একটা আলাপ  করেছিলেন, যার সাথে আবার স্যারের বিয়ে আটকে থাকার একটা ঘটনাও ছিল?

হাশেম খান : মুনতাসীর আপনার তো বান্ধবী কম ছিল না? আপনারা প্রায়ই দলবলে। চারুকলায় আসতেন আড্ডা দিতে। বিয়ে করার জন্য ফাতেমাকেই পছন্দ করলেন কেন?

মুনতাসীর মামুন : কারণ ওকেই ভালোবেসেছি। আর আজ এতকাল পরে বলতে পারি, ওকে পাশে না পেলে এতদূর পর্যন্ত আসা আমার সম্ভব হতো না। আর আমার বান্ধবীদের কথা যে বললেন ওরা আর কেউই কিন্তু আমার একার ছিল না। আমি সংস্কৃতি সংসদ করতাম, ইফফাত আরা দেওয়ান ওই সংসদের নেতৃস্থানীয় একজন, আমাদের সার্কেলে পরাগ ছিল, ছিল আজমেরী, দিলরুবা। দিলরুবা বেঁচে নেই। আমরা কেবল চারুকলায় না আমাদের আড্ডা ছিল পুরো বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেই।

রাজীব নুর : স্যার আপনার বিয়ের সঙ্গে শিক্ষকতায় যোগ দেওয়াটা বোধ হয় শর্তসাপেক্ষ হয়ে গিয়েছিল।

মুনতাসীর মামুন : আমি যাকে বিয়ে করতে চাইছি, তার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, এখন আমাকে ডিসাইড করতে হবে আমি কী করব। আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন ভালো পাত্র হিসেবে সাংবাদিককে আমলেই নিচ্ছে না। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারলে হয়তো যোগ্যতার মানদণ্ডে একধাপ এগিয়ে যেতে পারব। তাছাড়া আমার বাবা এবং চাচারাও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করলেন। কাজেই আমি ঠিক করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসব। ১৯৭৪ সালের ঘটনা সেটা, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলো আমরা আবেদন করলাম।

মোহাম্মদ সেলিম : স্যার, এই নিয়োগে বোধ হয় একটা ঝামেলা হয়েছিল, তাই নয় কি?

মুনতাসীর মামুন : একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘোরাঘুরি করছি, এই সময় হঠাৎ করেই আহমেদ কামালের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, সে মাত্র কদিন আগেই শিক্ষক হিসেবে জয়েন করেছে। আহমেদ কামাল আমাকে বলল তুই ঘুর ঘুর করছিস কেন? তোদের না কাল বাদে পরশু ইন্টারভিউ। আমি বললাম কিসের ইন্টারভিউ । আমি তো ইন্টারভিউ কার্ডই পাইনি। তখন আমার সঙ্গে ছিল আমার বন্ধু মকবুল এলাহী, ও পরে পেট্রোবাংলায় কাজ করেছে এবং এরই মধ্যে রিটায়ার্ড সঙ্গে দেখা করবে। আবদুল মতিন চৌধুরী তখন ভিসি। প্রথমে আমরা ডিপার্টমেন্টের স্যারদের কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম আপনারা বিজ্ঞাপনে যে সব ক্রাইটেরিয়া দিয়েছে স্যাররা জানালেন, ভিসি নিজে নাকি ঠিক করেছেন যে কাকে কাকে ডাকা হবে এবং কাকে ডাকা হবে না। আমরা ভিসির কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বর্ণিত সব ক্রাইটেরিয়াই ফুলফিল করে। কাজেই আমাকে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য ডাকতে হবে। ভিসি তার পুরোনো সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।

অবশ্য এখন ভাবি যে, ওরকম বয়সে ভিসির মুখের ওপর এরকম কথা বলা কম সাহসের ব্যাপার ছিল না। পরে ভিসি আগের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। প্রথমে যাদের ডাকা হয়নি তাদের সবাইকে ডাকার ব্যবস্থা করা হলো। আমার খেয়াল আছে প্রথমে যাদের ডাকা হয়নি তাদের মধ্যে আমরা ৬৪ জন একসঙ্গে চাকরি পেয়েছিলাম। পরবর্তী দুবছরে অবশ্য অনেকে বিদেশ চলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করার পরের বছর আমরা বিয়ে করলাম।

আহমেদ মাহফুজুল হক : মুনতাসীর মামুনের প্রথম বই প্রকাশের গল্পটা কিন্তু অসমাপ্ত রয়ে গেছে।

মুনতাসীর মামুন : এ ব্যাপারে ছিল আহমদ ছফার ভূমিকা। বাংলাবাজারের একটি প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানে বসে লেখালেখি করতেন সত্যেন সেন, তার ওইখানে তখন আমরা ঘুরেফিরেই যেতাম, মূলত বই কেনার জন্যই ছিল যাতায়াত। সদরঘাটে পুরোনো বই কিনব বলে ঘোরাঘুরি করতাম। আমার মনে আছে সদরঘাটের ফুটপাত থেকেই উপেন্দ্রকিশোর সম্পাদিত ‘সন্দেশ’ পত্রিকার প্রথম বছরের সংখ্যাগুলো কিনেছি। সেগুলো কিনতে পাওয়ার পর কী যে খুশি হয়েছিলাম তা আলী ইমাম বলতে পারবে। আলী ইমাম কিন্তু আমার সবচেয়ে পুরোনো বন্ধুদের একজন। সেই ১৯৬৩ সাল থেকে আমাদের যোগাযোগ, আমরা নিয়মিত চিঠি লিখতাম। আমি সেখানে প্রায়ই যেতাম। সেখানে আমার সঙ্গে পরিচয় হয় আহমেদ মাহফুজুল হকের সঙ্গে। মাওলা ব্রাদার্সের স্বত্ত্বাধিকারী তার চাচা। বাংলাবাজার, সদরঘাট ঘোরাঘুরির সময় কোনো একদিন সত্যেন সেনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন আহমদ ছফা এবং বললেন ওর একটা বই বের করা দরকার। আমি যে গল্পটির জন্য প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলাম, সেটিসহ আরো কয়েকটি গল্প নিয়ে আমার প্রথম বই প্রকাশ করলেন ‘কালি-কলম’ প্রকাশনীর আবদুল আলীম।

আহমেদ মাহফুজুল হক : আমি একটু বলি, মাওলা ব্রাদার্স তখন অনেক স্বনামধন্য প্রকাশনা সংস্থা। আমার চাচা দেশের বই প্রকাশের পাশাপাশি কলকাতার সব বইই নিয়ে আসতেন এখানে। মুনতাসীর যেতেন বইয়ের খোঁজে, দেখা গেল তিনি যে বইটি কিনতে চাইছেন সেটি আমাদের কাছে নেই। নামধাম লিখে দিয়ে বইটি আনিস অনুরোধ করতেন। সেগুলোর মধ্যে নীহাররঞ্জন রায়ের বিশাল বই ‘বাঙলার ইতিহাস’ যেমন থাকত, তেমনি আঠারো-উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ছাপা দুর্লভ সব বইও, সেগুলোর সব সংগ্রহ করে দেওয়া যেত না।

মোহাম্মদ সেলিম : মুনতাসীর স্যারের মধ্যে সবসময়ই নানামাত্রিক কৌতূহল দেখেছি আমরা।

মুনতাসীর মামুন : আমি তোমাদের আমার প্রথম বই প্রকাশের গল্পটা বলে শেষ করি। ছফা ভাই আমাকে সত্যেন সেনের হাতে সোপর্দ করলেন, সত্যেন সেনের অনুরোধে প্রকাশকও রাজি হয়ে গেলেন। কিন্তু বইয়ের তো একটা প্রচ্ছদ লাগবে। আমি তখনো একটা মফস্বলের ছেলে। একদিন বাংলাবাজার গেলাম, সেখানে আবারও সত্যেন সেনের সঙ্গে দেখা করলাম, তিনি তখন চোখে খুবই কম দেখতে পান। তারপরে তিনি রিকশা করে আমাকে নিয়ে রওয়ানা হলেন শিল্পীর বাসায়। আমরা গোপীবাগের কাছে নামলাম। তারপর বললেন তোমাকে একজন শিল্পীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি, তুমি এসে পরে এসে বইয়ের কাভারটা নিয়ে যেও! দরজা নক করার পরে যে শিল্পীর সঙ্গে দেখা হলো। সেই মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুলের হাশেম খানকে কিন্তু তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না। ওইটা ছিল আমার প্রথম বই। হাশেম ভাই কিন্তু আমার ইতিহাসের মুক্তি নামের দ্বিতীয় বইটির প্রচ্ছদ শিল্পী, সেটা ১৯৬৯ সালের কথা, আমি যখন ছাত্র তখনই ইতিহাসের ছাত্ররা এই বইটি পড়ত, বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়ন যারা করত তারা তো পড়তই।

হাশেম খান : ১৯৭৫ সালের কথা বলুন, সবাই যখন বাকশালে যোগ দিচ্ছিল তখন আপনি তা করেননি।

মুনতাসীর মামুন : আমি আসলে কখনোই কম্প্রোমাইজ করিনি। পড়ালেখায় কখনোই খুব ভালো ছিলাম না । কিন্তু লেখার কাজে নিরন্তর পরিশ্রম করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার চাকরি হওয়ার পেছনে ছিল লেখালেখির ওই ব্যাকগ্রাউন্ডটা। আমার তখন দুটা/তিনটা বই আছে। শিক্ষকতার চাকরিটা পাওয়ার পর ভাবলাম গবেষণা করব, গবেষণার জন্য বেছে বিষয় নিতে হবে। পূর্ববঙ্গ নিয়ে কেউ তখনো লেখালেখি করেনি, ঠিক করলাম পূর্ববঙ্গ নিয়ে, পূর্ববঙ্গের ঢাকা রাজধানী ঢাকা নিয়ে কাজ করব। আমি ১৯৭৬ সালে কলকাতা যাই এবং বিনয় ঘোষের সঙ্গে দেখা করি। বিনয় ঘোষ আমার মডেল ছিল। যাদবপুরে থাকতেন। আমি জানতাম না তিনি সচরাচর কারো সঙ্গে দেখা করেন না। আমার সঙ্গে দেখা করলেন কারণ আমি বদরুদ্দীন উমরের চিঠি নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি তার জন্য পাণ্ডুলিপি নিয়ে গেলাম। অর্বাচীন ছিলাম তো। কিন্তু বিনয় ঘোষ দেখে-টেখে বললেন ঠিক আছে আমি এগুলি কলকাতায় ছাপতে চাই। তো আমি বললাম যে, না আমি এগুলো আগে ঢাকায় ছাপাতে চাই। কেউ না ছাপলে আমি আপনাকে দিব। আমি কিন্তু ভুলেই পিয়েছিলাম আমি কার সাথে কথা বলছি। এবং কী বলছি। কিন্তু বিনয় ঘোষ। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার সাথে যোগাযোগ রেখেছিলেন। এবং তার সমস্ত বই স্বাক্ষর করে আমাকে পাঠিয়েছিলেন। আমি তখন কাজ শুরু করি। আমার বিষয় পূর্ববঙ্গ ঢাকা শহর। তারপর থেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ যোগাযোগটা শেষ হয়ে যায়। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগগদান করি তখন একটি বিষয় ঠিক করেছিলাম যে প্রতি বছর আমি একটি বই প্রকাশ করব। কোনো কিছু ভালো না লাগলে আমি অনুবাদ করব। বছর আমি একটি বই প্রকাশ করব। ১৯৭৪ থেকে এ পর্যন্ত এ কাজটা করে যাচ্ছি। বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখেছি। এক সময় আমি শিশুসাহিত্য করেছি, গল্প লিখেছি, সংস্কৃতি সমালোচনা করেছি, অনুবাদ করেছি। আমি তখন ঠিক করলাম যে আমি আর এগুলো করব না, বিশেষ করে গল্প লেখা ছেড়ে দেয়ার  সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার মনে হলো আল্টিমেটলি বাংলা সাহিত্য বা বাংলা ভাষায় তিরিশের থেকে পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত যারা গল্প লিখেছে, আমার গল্প তাদের ধারে কাছেও যাবে না- যত বড় গল্পকারই আমি হই। কিন্তু আমি যদি পূর্ববঙ্গের ইতিহাস লিখি তাহলেও উত্তরকালের গবেষকদের আমি ফুটনোটে থেকে যাব। আস্তে আস্তে ব্যাপ্তি লাভ করেছে আমার কাজ- ইতিহাসটাকে আমি সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছি। দ্বিতীয়ত আমরা অন্য কাজে যোগদান করেছি এবং এটার জন্য সবচেয়ে বড় ভূমিকা হচ্ছে হাশেম খানের। আমি যখন ১৯৭৪ সালে বিচিত্রায় কাজ করি তখনই বুড়িগঙ্গা রক্ষার জন্য আন্দোলন শুরু করি। উদ্যোগ নেই ঢাকা নগর জাদুঘর প্রতিষ্ঠার। এ কাজে আমার সঙ্গে হাশেম খানের সঙ্গে কবি-স্থপতি রবিউল হুসাইন অনেক সময় শ্রম-অর্থ দিয়েছেন। আমরা তিন জন বঙ্গবন্ধু জাদুঘর গড়ার কাজেও মূল ভূমিকা পালন করেছি। আমি সমন্বয়ক ছিলাম। তখন আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কাজ করেছি। এটা পুরো আমার নিজের হাতে সাজানো।

রাজীব নূর : হাশেম স্যারের অনুমতি পেলে আমরা এখন মুনতাসীর মামুনের প্রিয় ছাত্রদের একজন সেলিম ভাই, যিনি নিজেও এখন শিক্ষকতা করেন তাঁর কাছে মুনতাসীর মামুনের একটা মূল্যায়ন জানতে চেয়ে আজকের আলাপচারিতা শেষ করব।

মোহাম্মদ সেলিম : স্যার তো ক্লাসে অসাধারণ আমি বলব। স্যার যে বিষয়টা পড়ান অত্যন্ত যত্নের সাথে পড়ান। গুরুত্ব দিয়ে পড়ান। এতদিন শিক্ষকতা করার পরে, স্যার হঠাৎ একদিন ক্লাসে এসে শিক্ষার্থীদের বললেন আমার আজকে প্রিপারেশন নেই। আমি ক্লাসটা নেব না। ছেলেপেলে তাজ্জব, স্যারের যারা নতুন সহকর্মী তারাও তাজ্জব যে এত বছর শিক্ষকতার পরে মুনতাসীর মামুনের মতো একজন শিক্ষক নিজে বললেন যে, তাঁর প্রিপারেশন নেই। এই ক্লাসটা তিনি প্রয়োজনে পরে নেবেন। এই যে সৎ ও সরল স্বীকারোক্তি এটা বলার মতো সাহস কয়জন শিক্ষকের আছে?

Post a comment