Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

কড়া নাড়ার শব্দ।। মুনতাসীর মামুন

[গৌরচন্দ্রিকা: মুনতাসীর মামুন সাধারণত ইতিহাসবিদ ও প্রাবন্ধিক হিসাবে বহুল পরিচিত হলেও তাঁর আরো কিছু পরিচয় আছে, যা অনেকেই জানেন না। তিনি একাধারে একজন অনুবাদক ও ছোটগল্পকার। তাঁর লেখালেখির জীবন শুরু হয়েছিল অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে। ছোটগল্প ও শিশুসাহিত্য রচনাতেও তিনি সিদ্ধহস্ত। ‘কড়া নাড়ার শব্দ’ নামক গল্পটি লেখা হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। গল্পটি নেয়া হয়েছে মুনতাসীর মামুনের ‘কড়া নাড়ার শব্দ’ নামক গ্রন্থ থেকে। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালে; প্রকাশক ডানা প্রকাশনী। মুনতাসীর মামুনের জন্মদিন উপলক্ষে গল্পটি ব্লগে উন্মুক্ত করা হলো।] 

খেয়ে দেয়ে শুতে যাবে এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। আস্তে আস্তে ভয়ে ভয়ে কে যেন কড়া নাড়ছে। দরজা খুলবে কি খুলবে না হাসান দোটানায় পড়লো। যা দিনকাল। এইতো সেদিন সন্ধ্যায় তার এক বন্ধুর বাসায় রিভলবার নিয়ে ঢুকে কয়েকজন তরুণ টাকা পয়সা জিনিসপত্র এবং তার তরুণী বোনটিকে তুলে নিয়ে গেছে। পাড়া প্রতিবেশী ভদ্দর লোকেরা কেউ এগিয়ে আসেনি।

এখন রাত বেশী হয়নি, সাড়ে ন’ কি দশ। পাড়াটা একটু নির্জন। তাই হাসান ইতস্ততঃ করছিল। রেবা, হাসানের স্ত্রী বলে, ‘দরজা খুলো না কিন্তু।’

আবার শব্দ। না, দাবী নিয়ে কেউ এলে কড়া নাড়ার শব্দ অন্য রকম হতো। হাসান দরজা খুলে দেয়। বারান্দায় অধো আলোয় দেখে, পেট পিঠ এক হয়ে যাওয়া এক যুবক এবং সাত হাতি শাড়ী পরা এক যুবতী দাঁড়িয়ে। যুবতী অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে আছে, লজ্জায়। যুবকটি চারপাশে তাকিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলে, ‘দুইডা রুডি দিবেন ?’ বলে চুপচাপ নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকে। বিনম্র এই ভঙ্গী দেখে হাসান নিঃশব্দে রান্নাঘর থেকে সকালের নাস্তার জন্যে রাখা পাঁচটা রুটির দুটো এনে দেয় যুবকটিকে। যুবকটি একবার মুখ তুলে তাকায় তারপর ছায়ার মতো মিলিয়ে যায়। হাসান দরজা বন্ধ করে নিঃশব্দে ফিরে আসে শায়িতা স্ত্রীর কাছে।

‘কি ব্যাপার, কে এসেছিলো ?’ জিজ্ঞেস করে রেবা। হাসান বলে। রেবা ঝংকার দিয়ে ওঠে, ‘দু’ দুটো রুটি দিয়ে দিলে, কাল সকালে খেয়ে যাবে কি? একটুও অক্কেল নেই, সংসার কিভাবে চলে জানো?’

দুটো তুচ্ছ রুটির জন্যে হাসান কোনদিন এভাবে রেবার ঝংকার শোনেনি। কিন্তু এখানে, ঢাকা থেকে দশ মাইল দূরে নির্জন পাড়ায় বাসা বদল করার পর থেকে রেবা যেন কেমন খিটখিটে হয়ে পড়েছে। হাসান তাই আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ বিছানায় পাশ ফিরে শোয়।

আগে শান্তিনগরে থাকার সময় হাসান কোনদিন ভাবেইনি যে তাকে এই ধপধড়া গোবিন্দপুরে অসতে হবে। এই কয়েক মাস আগে পর্যন্ত শান্তিনগরে হাসান বেশ শান্তিতেই ছিল। এক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করে মাসিক ছশো টাকা পেতো। স্বচ্ছন্দে দিনগুলো প্রেম করার সময়ের মতো হেসেখেলে কেটে যেতো।

কিন্তু তারপর ঢাকা শহরের বাড়ীঅলারা সব হঠাৎ করে বিগড়ে যেতে লাগলো। হাসানের বাড়ীঅলাও এর ব্যতিক্রম হলো না। অহরহ তার মুখ ভার। যা ভাড়া পাচ্ছে তাতে পোষাচ্ছে না। সাড়ে তিনশো পর্যন্ত হাসান উঠেছিলো তারপর আর পারলো না। পাগলের মতো এদিক-সেদিক বাড়ী খুঁজতে লাগলো, পেলো না। অতএব হাসান তখন বাধ্য হলো দশ মাইল দূরে এই টিনের পৈত্রিক ঘরের কথা ভাবতে।

এতোদিন এক উদ্বাস্তু পরিবার বিনা ভাড়ায় এখানে থাকতো। হাসান নিজে বছর কয়েকের মধ্যে এদিকে আসেনি। একদিন রোববার, ছুটির দিনে হঠাৎ সে এই অপোগণ্ড পাড়ায় হাজির। উদ্বাস্তু পরিবার উৎখাত এবং নিজের আগমন বা নির্বাসন।

রেবা প্রথম থেকেই নাক সিটকাচ্ছিলো। ছিঃ ছিঃ শেষে ঢাকা শহর ছেড়ে কোন এক অজ পাড়ায় থাকতে হবে। তার বান্ধবীদের সঙ্গে দেখা হলে বলবে কি ? হাসান বলেছিলো, ‘বলবে এই শহরে, এই শব্দের মধ্যে থাকতে ইচ্ছে করছে না তাই কান্ট্রিসাইডে চলে যাচ্ছি।’ বি, এ, পাস করা মেয়ে রেবা মুখে কিছু না বললেও মনে মনে ক্ষিপ্ত হয়েছে। হাসান বাইরে খুব কেয়ার ফ্রি ভাব দেখিয়েছে, কিন্তু ঠেলাগাড়ীতে করে মাল নিয়ে যাবার সময় তার মনে এক আক্লোশ জন্ম নিয়েছে। কিন্তু আক্রোশটা যে কার বিরুদ্ধে তা সে নিজেও জানে না।

নতুন বাড়ীতে এসে তো রেবার প্রথম থেকেই মুখ ভার। তার ওপর আশপাশে যারা থাকেন তারা একটু নীচু দরের চাকুরে। তফাৎটা ছিল রেবারা একবেলা রুটি খায় ভাজিটাজি বা তরকারি দিয়ে। তারা দু’বেলা রুটি খায়। একবেলা স্রেফ ডাল দিয়ে। অন্য বেলা শুকনো রুটি নয় তো এক টুকরো গুড় দিয়ে। তফাৎটা নজরে পড়ায় রেবা পরে একটু শান্ত হয়েছে।

হাসান প্রতিদিন অফিস টাইমের দু’ ঘন্টা আগে রওয়ানা হয়, অবশ্যই বাসে। ফেরে অফিস টাইমের দু’ ঘণ্টা পর। প্রথম প্রথম বাসে চড়তে ভীষণ অস্বস্তি লাগতো হাসানের। বাসে উঠেই চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে দেখতো পরিচিত কেউ আছে কি না।

প্রথমদিন এমনিভাবে ভীড়ের মধ্যে হাসান চোখ দুটোকে সার্চ লাইটের মতো ঘোরাচ্ছে এমন সময় অফিসের কেরাণী সালাম সাহেবের সঙ্গে চোখ চোখি। হাসান তো প্রায় অজ্ঞান হয়ে যায় আর কি! কি কেলেংকারী। আজি পুরো অফিসে এটা রাষ্ট্র হয়ে যাবে। তারপর সবাই হাসানের দিকে বাঁকা চোখে তাকাবে। ছোটখাটো বস হিসেবে, কেউ তার কথা শুনতে চাইবে কি না সন্দেহ।

কিন্তু বাস থেকে নেমে সালাম সাহেব নিজেই কথা ওঠান, ‘বুঝছেন স্যার, আর কয়েকদিন পর বাসে করেও আসা যাবে না। এতো ভীড় হৈ চৈ, কোন ভদ্রলোক সহ্য করতে পারে। আর এত দূর থেকে তো রিকশাও পাওয়া যায় না।’ হাসান মাথা নেড়ে খুশী মনে সায় দিয়েছে।

এমনি করে চলছিলো। রেবার মুখ ভার এখনও কমেনি। অবশ্য হাসান সে সব নিয়ে মাথা ঘামাবার অবসরও এখন পায় না। ঘুম থেকে উঠেই অফিস। সন্ধ্যায় ফিরে ঝিমুনি। জীবনে এখন একটিমাত্র লক্ষ্য-নিয়মিত অফিস করা।

এমনি একদিন লঞ্চের সময় হাসানের অফিসে তার এক পুরনো বন্ধু হাজির। হাসান প্রথমে কামালকে দেখে খুব খুশী হয়ে ওঠে। আগে যখন সে শহরে থাকতো তখন প্রতিদিন সন্ধ্যায় কোথাও না কোথাও আড্ডা দিতে যেতো। মাঝে মাঝে রেবাকে নিয়ে সিনেমায়, শহরতলীতে যাবার পর সে এসব ভুলেই গেছে। অথবা তার এখন সে রকম অবকাশ নেই। এই তো সেদিনের কথা অথচ মনে হয় কতদিন আগের কথা।

প্রাথমিক উচ্ছাস কাটার পর হাসান চিন্তা করতে লাগলো কামালকে এক কাপ চা খাওয়াবে কি খাওয়াবে না ? কামালের জীর্ণ পোষাক এবং শীর্ণ চেহারা দেখে সে আরও দমে গেলো। এক মাসে কামালের বয়স যেন দশ বছর বেড়ে গেছে। আচ্ছা কামাল যদি এখন তার কাছে বিশটা টাকা ধার চায় ? তা হলে ? সর্বনাশ হয়ে যাবে। এ প্রশ্ন যাতে না ওঠে সে জন্যেই হাসান অন্তরঙ্গ সুরে বলে, ‘চল, চা খেয়ে আসি।’

চা খাওয়ার পর সিগারেটের জন্যে মন উসখুস করে। হাসানের ব্ৰাণ্ড ক্যাপস্ট্যান। দ্রব্যমূল্যের এই উর্ধগতির মধ্যেও সে ব্রাণ্ড বজায় রাখতে সচেষ্ট। সিগারেট ধরালে কামালকে একটা দিতে হবে, খাবার সময়ও সে আরেকটা চাইতে পারে-এ ভেবে হাসান সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছে দমন করছে এমন সময় কামলি অনিমনে বাইরের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘বুঝলি হাসান, মাইনে পাই পাঁচশো আর চালের মন তিনশো, পরিবারের সংখ্যা চার…।’ খুব হেসে হেসে কামাল কথাটা বলে কিন্তু হাসানের বুকের মধ্যে যেন কেমন করে ওঠে। সে তাড়াতাড়ি একটা সিগারেট অফার করে কামালকে। অতঃপর সিগারেট টানতে টানতে তারা রাস্তায় বেরোয়। ফুটপাতের এদিকে সেদিকে অর্ধনগ্ন অনাহারী প্রাণীরা শুয়ে। ক্ষিধেয় অবসন্ন, দেখে মনে হয় পরমেশ্বরের কৃপা লাভের জন্যে ধ্যানে মগ্ন। লিকলিকে শিশুরা যাদের মুখে দুধের আর রোদের গন্ধ থাকার কথা, গড়াগড়ি খাচ্ছে ধুলোয়। হাসান অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কামাল বলে, ‘এখন অরি কি দেখছিস। এই তো শুরু। কয়েকদিন পর পুরো শহর ভরে যাবে। হাঁটার জায়গাও থাকবে না। কিন্তু ভেবে দেখ, আমরা কিন্তু এখনও ঘরে আছি।’ হাসানের গা শির শির করে ওঠে। সেদিন বাসায় ফেরার সময় নিজেকে তার খুব ক্লান্ত লাগে। মনে হয় বাসটা খুব আস্তে আস্তে চলছে।

জানালা খুলতেই অসন্ন শীতের গন্ধ পেলো হাসান। মনটা এক মুহূর্তে ভরে ওঠে। শীত তার প্রিয়। শীতের ভোর, শীতের রোদালো দুপুর, গোধুলী সব কিছুই হাসানের বেঁচে থাকার ইচ্ছেকে দ্বিগুণ করে তোলে। হাসান রেবাকে ডাকে। সাড়া পায় না। কিছুক্ষণ পর বারান্দায় গিয়ে দেখেন রেবা অনিমনে দাঁড়িয়ে আছে। হাসান জিজ্ঞেস করে, ‘কি হয়েছে রেবা, শরীর খারাপ ?’

হাসান জানতে পারলো সে বাবা হতে চলেছে। কিন্তু এর মানে তো অনিন্দ। রেবা তাহলে মিন মিন করে কাঁদে কেন ? হাসান অবাক হয়ে যায়। রেবাকে জিজ্ঞেস করার পর সে খালি বলে, ‘আমার ভালো লাগে না, এসময়-এসব ঝামেলা…।’ হাসান তাকে বোঝায়, এসব সাময়িক অর্থাভাবে সংসারে জটিলতা বৃদ্ধি করে সত্যি, কিন্তু তা’হলেও কি সংসারে সংসারী মানুষেরা বেঁচে থাকে না ? কোন দিন একটি সুখ সংবাদ পেলে কি মানুষ একটু আনন্দ করবে না ? রেবা তারপরও সারাদিন মুখ ভার করে থাকে। হাসান ও মুখভার করে থাকতে বাধ্য হয়।

এভাবে দিন কেটে যায়। হাসান সারাদিন কাজ করে, ফুটপাতে বিবর্ণ মানুষের ভিড় দেখে অবার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাসায় ফেরে। সংসারের টানাটানি, অনাগত সন্তানের জন্যে রেবার মুখভার সব তাকে ক্লান্ত করে তোলে। রাতে শুয়ে রেবার সঙ্গে দু’ একটি খুটি-নাটি আলাপ করতে ইচ্ছে হয় অনাগত সন্তান সম্পর্কে, রেবা মাঝে মাঝে যান্ত্রিকভাবে জবাব দেয়, মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলে ‘বেতন পাও কতো ? একটিন দুধের দাম জানো ?’ হাসানের লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে হয়। রেবাকে মনে হয় প্রতিবেশী।

মাসের এক তারিখ । অফিস ছুটির পর অজি অরি তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করলো না হাসানের। রেবার জন্যে অজি পছন্দসই কিছু বাজার করবে। রেবাকে একটু হাসি-খুশী রাখা উচিত। আসলে এই প্রথম বার তো, তাই বোধ হয় রেবা ভয় পাচ্ছে। আসলে এসব কিছুই না।

গল গল করে লোক বাস স্টপে জমছে। হকাররা পত্রিকা বিছিয়ে ফুটপাতে বসে। দৈনিক বাংলার প্রথম পাতায় দু’হাত তুলে অবেদন জানানো একটি হাড়সর্বস্ব লোকের ছবি ছাপিয়ে ক্যাপশন দেয়া হয়েছে-

‘এরাও মানুষ। কিন্তু এরা কি মানুষের মর্যাদা ভোগ করছে ? কেন। এরা দুঃসহ দারিদ্রের যন্ত্রণা ভোগ করে ? দুগ্ধপোষ্য অসুস্থ অপুষ্ট শিশু কেন ক্ষুধার তাড়নায় শক্ত গমের দানা মুখে দিতে বাধ্য হয়।’

বেশ জ্বালাময়ী ক্যাপশন। হাসান মনে মনে তারিফ জানিয়ে অলস ভাবে ইত্তেফাকে চোখ রাখে।

‘গত রবিবার গভীর রাত্রিতে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে ষ্টেশনের প্লাট ফর্মে তোলা একটি আলোকচিত্র। ক্ষুধায় কাতর ছোটরা অবসন্ন দেহে ঘুমাইয়া পড়িলেও হতভাগ্য পিতা-মাতার চোখে ঘুম নেই। তাদের মনে আজ অনন্ত জিজ্ঞাসা।’

আর ভালো লাগে না। সারাদিন সংসারের চাকায় নিজেকে পিষে ছিবড়ে করে দেয়ার পরও যদি এসব দেখতে হয় ! হাসান আশ্চর্য হয়ে দেখে আর ভাবে এসব ব্যাপারকে সবাই স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে। আর বলিহারী লোকগুলিকে, গ্রাম থেকে ভিটেমাটি ছেড়েই যদি এলি, তাহলে ফুটপাতে চুপচাপ ধুঁকে মরছিস কেন? সজোরে কড়া নেড়ে শহরবাসীর কাছে খাবার চাইলেই হয়। তারপরেই সে ভাবে, আর এতোবড় ঢাকা শহর, কোথাও গিয়ে যে একটু সময় কাটাবো তারও উপায় নেই। সবাই নিজের ধান্ধায় ব্যস্ত। কোথায় দশটা টাকা বেশী পাওয়া যাবে তারই খোঁজে সবাই ছুটছে। কি যে হলো দেশটার-হাসান মনে মনে আক্ষেপ করে।

সময় কাটানো সম্পর্কে একটি মজার ঘটনার কথা বলেছিলো তার এক পুরনো বন্ধু সালাম। সালাম একে অখ্যায়িত করেছিল ‘একমাত্র রিক্রেয়েশন’ হিসেবে। সালাম বলেছিলো, একদিন এক দোকান পাড়ায় অতি সুন্দর এক মেয়েকে দেখা গেল উইণ্ডো শপিং করছে। সালাম এসব ব্যাপারে অভিজ্ঞ। লোক দেখলেই সে বুঝতে পারে কে কোন লাইনের। তাই সেও সোৎসাহে উইণ্ডো শপিং শুরু করে এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে একটি শো কেসের সামনে দাঁড়িয়ে দু’জন আলাপ শুরু করে-

‘কি সুন্দর শাড়ী’, সালাম বলে।

‘হ্যাঁ, সত্যিই সুন্দর কিন্তু দাম একটু বেশী’, মেয়েটি বলে।

‘তাতে কি চলুন, প্রথম পরিচয়ের স্মারক চিহ্ন হিসেবে আপনাকে কিনে দিই।’

এরপর শাড়ী কিনে দিয়ে মেয়েটিকে সে তার এক বন্ধুর নির্জন বাসায় নিয়ে গিয়েছিলো। কথায় কথায় নিজের সম্পর্কে মেয়েটি মাত্র একটি কথা জানিয়েছিলো তাকে বাঁচতে হলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে এবং পড়াশোনা ও আনুষাঙ্গিক খরচ চালাবার জন্যে তাকে মাসে দু-একদিন উইণ্ডো শপিং করতে হবে।

হাসনি মনে মনে হাসলো। সালামের মতো তার এতো পয়সা নেই বা ইচ্ছেও নেই সুতরাং এসব চিন্তা করা বাহুল্য মাত্র। তাছাড়া রেবা মুখ ভার করুক আর নাই করুক এটা তো সত্যিই যে কিছুদিনের মধ্যে সে বাবা হতে যাচ্ছে। অনাগত সন্তানের কথা মনে হতেই হাসানের মন শীতের দুপুর বা সন্ধ্যার মতো সুন্দর হয়ে গেলো।

এ রকম একটা আমেজ নিয়েই সে আনমনে চলছিলো। হঠাৎ ম্লান একটা চিৎকার শুনে থমকে দাঁড়ালো এবং পরক্ষণেই আঁতকে উঠলো। ফুটপাতে বছর দুয়েকের একটি শিশু শুয়ে আছে। মুখে, শরীরে মাছি; তার মা বোধ হয় কোথাও গেছে অন্নের খোঁজে। আর হাসান অন্যমনস্কভাবে শিশুটির হাত মাড়িয়ে দিয়েছে। হাসনি অবাক বিস্ময়ে এবং ভয়ে ভয়ে লক্ষ্য করলো ব্যাথায় বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও আর চিৎকার করার মতো শক্তি শিশুটির নেই।

বাজারে যেতে আর ইচ্ছে করলো না হাসানের। সঙ্গে সঙ্গে বাস ধরে বাসায় ফিরে এলো। এবং এতোদিনে এই প্রথম দিন হাসান খাবার মুখে তুলতে পারলো না। বার বার ঘুরে ফিরে তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো ফুটপাতে শুয়ে থাকা নিরন্ন সব শ্যামল মানুষের দঙ্গল, খবরের কাগজের ক্যাপশন, সব কিছু ছাপিয়ে সেই শিশুটির বিবর্ণ হয়ে যাওয়া মুখ। তার নিজের অনাগত সন্তানের ভবিষ্যত যে এমন হবে না এই গ্যারান্টি সে পাচ্ছে কোথায় ? এ কথা ভাবতেই সে শিউরে ওঠে। পিতা হওয়ার যে অমেজ মনে ছিলো তা কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। তাহলে রেবাই ঠিক। নিজের ওপর ঘেন্না জাগে এ ভেবে যে-এখন সে বাবা হতে চলছে, রেবার দিকে আরেকবার তাকিয়ে সে মনে মনে প্রার্থনা করে, আমি বাবা হতে চাই না। বার বার একথা ফিরে আসে মনে, আর হাসানের ভিতরটা কাঁপতে থাকে, ভাঙতে থাকে, সে ভাবে, কেন এমন হয় ? কেন কেউ কিছু বলে না?

বার বার হাসানের মনে এ কথা ঘুরপাক খায়। তার সামান্য একটি দাবী, একটি শিশুর আকাঙ্খা, এ দাবী কাউকে সে মন খুলে বলতে পারে না। অপরাধীর মতো থাকতে হয়। বাসায় ফিরে ঘুমোতে পারে না। রেবা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে থাকে। রেবার এ ভঙ্গী তাকে ক্রুদ্ধ করে তোলে, অসহায় করে তোলে, হতাশ করে তোলে। রেবাকে আঁকড়ে ধরে মনের জ্বালা মেটায় তারপর ক্লান্তি এবং নিটোল ঘুম।

এরপরই ঘুমের ওষুধ হিসেবে রেবকেই বেছে নেয় হাসান। কিন্তু কয়েকদিন পর দেখলো এও শুধু ক্লান্তি দেয়। ঘুম দেয় না। হাসান একটু ঘুমের জন্যে এপাশ ওপাশ করে। ঘুম আসে না। মনে মনে শহরের প্রতিদিনের চিত্র আঁকে আর ছটফট করে, ভাবে, গ্রাম থেকে দলে দলে লোক ছুটে আসছে। হা অন্ন হা অন্ন রব চারদিকে। শহর, শহর তলীতে তারা সুবেশ নাগরিকদের ঘরে ঘরে কড়া নাড়ছে। হাসানের মনে পড়ে প্রথম দিনের সেই যুবক-যুবতীর কথা যে দু’জন মৃদুভাবে কড়া নেড়ে লজ্জিতভাবে খাবার চেয়েছিলো। এখনও কি তারা ঐভাবে খাবার চাইছে ? হাসান ভাবে, নাকি ঝম ঝম করে সজোরে তারা কড়া নাড়ছে।

‘হয়তো একদিন রাতে আমার ঘরের কড়াই সজোরে নড়ে উঠবে’, ভাবে হাসান, ‘দরজা খুলে দেখবো, সেই দু’জন যুবক-যুবতী দাঁড়িয়ে, চোখে চোখ রেখে বলছে—খাবার দ্যান। ’

Post a comment