Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

আদর্শ থেকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করে গিয়েছি : মুনতাসীর মামুন

[সম্পাদকীয় নোট: গণহত্যা জাদুঘরের সভাপতি মুনতাসীর মামুনের এই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল এনটিভি অনলাইনে, ২৬ মার্চ ২০১৬-তে। ড. মুনতাসীর মামুন প্রায় সাড়ে চার দশক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, গবেষক, শিল্পসংগ্রাহক, বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি খ্যাতিম্যান ও জনপ্রিয়। উনিশ শতকের পূর্ববঙ্গ, ঢাকা, মুক্তিযুদ্ধ, সিভিল সমাজ, সমকালীন সমাজ ও রাজনীতি, অনুবাদ, ভ্রমণ তাঁর চিন্তার ক্ষেত্র। যদিও ছোটগল্প ও কিশোরসাহিত্য রচনা মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যজীবনের উন্মেষ ঘটেছিল। দেশে-বিদেশে প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশোর অধিক। মুনতাসীর মামুনের জন্ম ১৯৫১ সালের ২৪ মে ঢাকার ইসলামপুরে নানার বাড়িতে। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার গুলবাহার গ্রামে। তার বাবার নাম মেজবাহ উদ্দিন খান এবং মায়ের নাম জাহানারা খান। পিতামাতার তিন পুত্রের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ। আজ মুনতাসীর মামুনের জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর পুরনো সাক্ষাৎকারটি গণহত্যা জাদুঘরের ব্লগে পুনঃপ্রকাশিত হলো। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন মাহবুব রেজা। ব্যানারে ব্যবহৃত স্কেচটি করেছেন শাকিলা চয়ন।]   

মুনতাসীর মামুনের গবেষণার বিষয় উনিশ, বিশ ও একুশ শতকের পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশ ও ঢাকা শহর। পূর্ববঙ্গের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনায় তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন। ঢাকা শহরের ইতিহাস ও তাঁর নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বাংলাদেশের সাধারণ পাঠকদের কাছে ইতিহাসকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র ও সিভিল সমাজের সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে রচিত তাঁর গ্রন্থ ও বিভিন্ন রচনা বিদগ্ধ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জেনারেল এরশাদের শাসনামলে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ভাষ্য লেখা শুরু করেন মুনতাসীর মামুন। পরবর্তী প্রায় দুই দশক তাঁর সেই সব ভাষ্য সামরিকায়ন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রায়ন ও সিভিল সমাজের পক্ষে জনমত সংগঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। মুনতাসীর মামুন দুই হাতে লেখেন না- লেখেন দশ হাতে এ রকম কথা প্রচলিত আছে এপার বাংলায় ওপার বাংলায়। তাঁর রয়েছে একাধিক পরিচয়। তিনি তাঁর প্রতিটি পরিচয়ে সফল।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী অনুসন্ধানী বিশাল রচনা তাঁকে সমসাময়িক সময়ে সবার চেয়ে আলাদা করেছে- করেছে স্বতন্ত্র। খ্যাতিমান হয়ে উঠেছেন তিনি মুক্তিযুদ্ধের গবেষক হিসেবে। তাঁর রচিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থ দলিল হিসেবে স্বীকৃত। শুধু তাই নয় দুটি প্রজন্মকে তিনি মুক্তিযুদ্ধ মনস্ক করে তুলতে অবদান রেখেছেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিষয়ে তাঁর রচনা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। তাঁর কঠোর সমালোচকরাও একথা কায়মনোবাক্যে কবুল করে নেন যে, মুনতাসীর মামুন এক জীবনে যতগুলো ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন তাঁর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখালেখি অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে তিনি অসাধারণ, অনবদ্য, মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, পাকিস্তানি জেনারেলদের মন, মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধের ছিন্ন দলিলপত্র, রাজাকার সমগ্র, ইয়াহিয়া খান ও মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭১ চুকনগরে গণহত্যা, একাত্তরের বিজয়গাথা, পরাজিত পাকিস্তানি জেনারেলদের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ, পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে ১৯৭১, বাংলাদেশ চর্চা, ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, বলে যেতে হবে মুক্তিযুদ্ধের গাঁথা, মুক্তিযুদ্ধ কোষ, [১২ খণ্ড] যেসব হত্যার বিচার হয়নি, রাজাকারের মন, সেইসব পাকিস্তানি মুক্তিযুদ্ধ সমগ্র [২ খণ্ড], বঙ্গবন্ধু কীভাবে স্বাধীনতা এনেছিলেন, ১৩নং সেক্টর, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের কথা, কিশোর মুক্তিযুদ্ধ কোষ, শান্তি কমিটি ১৯৭১, বীরাঙ্গনা ১৯৭১, যে দেশের রাজাকার বড়, আলবদর ১৯৭১, গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ [২২ খণ্ড, সম্পাদনা], ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালা [২১ খণ্ড; সম্পাদনা]।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের সঙ্গে সম্প্রতি কথা হলো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, তিনি বলেছেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নিজের উপলব্ধির কথা।

মাহবুব রেজা : গত চার দশক ধরে উনিশ শতকের পূর্ববঙ্গ, ঢাকা বিষয়ক গবেষণা, চিত্রকলা, সমালোচনা, গল্প-উপন্যাস, অনুবাদ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ সংবাদ ভাষ্যকার সর্বোপরি অধ্যাপনা এসব নিয়ে তো আপনার প্রচন্ড ব্যস্ততা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও আপনার লেখা আছে। কিন্তু আমরা দেখছি গত দশক ধরে আপনাকে দেখা যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপনি একাগ্রভাবে, নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।

মুনতাসীর মামুন : বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার গবেষণার বিষয় ছিল উনিশ, বিশ ও একুশ শতকের পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশ ও ঢাকা শহর। সে সময়ের পূর্ববঙ্গের সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনা ও গবেষণা করতে গিয়ে আমি বেশ রোমাঞ্চিত হই। পূর্ববঙ্গের গবেষণা করতে গিয়ে বিশেষ করে ঢাকাকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হয় আমাকে। আমার জন্ম পুরান ঢাকার ইসলামপুরের আশেক লেনে। জন্ম থেকেই এই শহরের প্রতি আমার এক ধরনের ভালোবাসা রয়ে গেছে। এখন অবশ্য তা হ্রাস পাচ্ছে। কারণ সবাই মিলে এখন ঢাকাকে পৃথিবীর দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম শহর করে ফেলেছে। তবুও বলতে হয়, প্রথম প্রেমের রেশ তো সবসময় থেকেই যায়।

পূর্ববঙ্গের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস গবেষণার সময় আমার প্রাসঙ্গিক বিষয় ছিল ঢাকা। পাশাপাশি দেশের সিভিল সমাজ, বৈদেশিক সম্পর্ক, আমলাতন্ত্র সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়েও কাজ করতে হয়েছে। এসব কাজ করতে। আমি সবসময় মনে করেছি মানুষের সামনে অনালোকিত সত্য ও তথ্যকে নতুন করে তুলে ধরতে। নতুন প্রজন্মের সামনে যদি প্রকৃত সত্য ইতিহাস ও ঘটনা না থাকে তাহলে জাতি হিসেবে আমাদের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ রয়ে যাবে। আর সত্য ও তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাস না থাকলে জাতির এগিয়ে যাওয়ার পথও মসৃণ হয় না।

মাহবুব রেজা : সত্য ও তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাস বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন?

মুনতাসীর মামুন : একটু খোলসা করে বলি। আমি সবসময় বলেছি বাংলাদেশ হলো সব সম্ভবের দেশ। এ নামে আমার বইও আছে। আমরা কেন বলি বাংলাদেশ সব সম্ভবের দেশ। বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস তো তা বলে না। এখানকার মানুষের রয়েছে হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য। ধারাবাহিক ইতিহাস বলে আমাদের নিজস্ব সত্য আর সত্যবাদিতার কথা। এখানে পরম্পরায় বিষয়ও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এভাবেই চলে আসছিল। নানা পট-পরিবর্তন, রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ও ডাকে বাঙালি স্বাধীন দেশের সূচনা হলো- লাল সবুজের পতাকায় দেশকে বিশ্বসভায় পরিচিত করল। আমরা একটি স্বাধীন দেশের বাসিন্দা হলাম। আমরা বাঙালি জাতিসত্তায় নিজেদের পরিচয়কে বিশ্বে ছড়িয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পরাজিত পাকিস্তানি ও তাদের দোসররা স্বাধীন দেশেও সমানভাবে সক্রিয় ছিল যার প্রমাণ পাওয়া গেল দেশ স্বাধীনের পরপর নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্যদিয়ে পাকিস্তানি চক্রটি প্রকাশ্যে চলে এলো। দেশকে তারা পাকিস্তানমুখো করার এজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হতে লাগল। জেনারেল জিয়া এলেন এরপর। দেশের প্রকৃত ইতিহাস ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হওয়া শুরু হলো সে সময় থেকে। ইতিহাস বিকৃত হওয়ার শুরু তখন থেকে স্বাধীনতার ইতিহাসকে শাসকগোষ্ঠীরা তাদের ইচ্ছেমতো প্রণয়ন করতে শুরু করল। এ কাজে শাসকগোষ্ঠীকে সাহায্য-সহায়তা করেছে এক শ্রেণীর মতলববাজ তথ্যসংগ্রহকারী যাদের ন্যূনতম নীতি-নৈতিকতা নেই- ইতিহাসের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে বিস্তর। পাকিস্তানি সহযোগীরা তাদের পূর্ব পরিকল্পনার ছকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ও এর উদ্দেশ্যকে নিজেদের মতো করে নির্মাণ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। সে সময় উর্দি পরা সামরিক শাসকরা বাংলাদেশকে তাদের ইচ্ছে মতো চালাতে সব ধরনের অপকৌশল ও ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। যার ফলে দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ও অন্যান্য বিষয়ের প্রকৃত তথ্য বিকৃতি রূপ পেতে লাগল। দেশকে নিয়ে যাওয়া হলো পাকিস্তানি ধারায়- দেশ চলল পাকিস্তানি কায়দায়। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিরা সামরিক শাসকদের ছত্রছায়ায় নতুন করে উজ্জীবিত কোনো কোনো ক্ষেত্রে হৃষ্টপুষ্ট হতে লাগল। জামায়াতের রাজনীতিকে উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো- যুদ্ধাপরাধীরা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে লালন হতে লাগল। এ অবস্থায় দেশ গভীর এক সংকটের মধ্যে নিপতিত হলো। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলোকে নানা কায়দা-কানুনে রোধ করার প্রক্রিয়া শুরু হলো।

আমরা যারা মুক্তবুদ্ধির চর্চা করি, স্বাধীনতার কথা বলি, সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করি, ইতিহাসের কথা বলি তারা নানাভাবে ঝামেলার মুখোমুখি হতে শুরু করলাম। সে সময় সামরিক ফরমান থেকে উদ্ভূত জাতীয়তাবাদী ভাবধারা উজ্জীবিত এক শ্রেণির করিৎকর্মাদের লম্ফঝম্ফ ছিল চোখে পড়ার মতো। কারণ তারা শাসকদের মর্জি মতো দেশকে পেছনের দিকে অর্থাৎ অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে ছিল বদ্ধপরিকর। এসব অবাঞ্ছিত, অতি উৎসাহীদের, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে আমাদের অগ্রসর হতে হয়েছিল। সাহস করে সত্যকথা উচ্চারণ করা সে সময় বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

সামরিক শাসক জিয়ার পর এরশাদ ক্ষমতায় এলেন। দেশের ওপর চলল স্টিম রোলার। প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির ডালপালা ছড়িয়ে পড়ে। নব্বইয়ের গণআন্দোলনে মানুষ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বৈরচারের বিরুদ্ধে সর্বোপরি গণতন্ত্রের পক্ষে নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছে। এসবের মধ্য দিয়ে মানুষ কিন্তু যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য ও তথ্যনিষ্ঠতার দিকে তাদের অবস্থানের ভিতকে জোরালো করেছে।

আমি একটা বিষয় সবসময় পর্যবেক্ষণ করেছি। তাহলো, আমাদের দেশের মানুষ ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ থেকেছে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষায় বাঙালি কখনই পিছপা হয় না। পরিবর্তিত পরিস্থিতি হয়তো মাঝে মধ্যে এ দেশের মানুষকে সাময়িকভাবে স্তব্ধ করে দেয় কিন্তু অন্তিমে মানুষ জেগে ওঠে। জুলুম-নির্যাতন চাপিয়ে দেয়া অসত্য তথ্য মানুষের স্বাভাবিক গতিময়তাকে আটকে রাখতে পারে না। জিয়ার দুঃশাসন, এরশাদের স্বৈরাচারী শাসন মানুষকে একাত্ম করে তুলেছিল। নব্বই পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রের যে অগ্রযাত্রা হওয়ার কথা ছিল তা মুখ থুবড়ে পড়েছিল মূলত বিএনপির কারণে। একানব্বইয়ে বিএনপি ক্ষমতাসীন হয়ে দেশকে আবার নতুন করে পাকিস্তানের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করে। সে সময় গোলাম আযমকে জামাতায়াতের আমির হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হলে দেশের মানুষ এর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফুঁসে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব মানুষ।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাংলার মানুষ আবার ঐক্যবদ্ধ হলো। এ সময় শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল সমন্বয় কমিটি গঠিত হলে বিএনপি তা প্রতিরোধে সক্রিয় অবস্থান নেয়। গণআদালত গঠন করে গোলাম আযমসহ অন্যদের ফাঁসির রায় দেওয়া হলে দেশের ২৪ বিশিষ্ট নাগরিকের বিরুদ্ধে বিএনপি রাষ্ট্রদ্রোহ আমলা করে। পরে গোলাম আযম নাগরিকত্ব ফিরে পান- ওই ঘটনা বিএনপি খুব কৌশলের সঙ্গে সম্পন্ন করে দেশের রাজনীতিকে আরো জটিল করে ফেলল।

আমরা যারা সোচ্চার ছিলাম তারা নির্মূল কমিটির কর্মকাণ্ডকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছি। যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত হয়েছে। দেশের মানুষ বিলম্বে হলেও আওয়ামী লীগের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। দেশের মানুষ সত্যটাকে বিচার করতে চায়। বিগত দিনে এ দেশে সামরিক শাসক, অনির্বাচিত সরকারগুলো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল তথা স্বাধীনতাবিরোধীদের এমনভাবে লালন-পালন ও ভরণ-পোষণ করে (এটাকে জামাই-আদরও চলতে পারেন) বড় করে তুলেছিল যে তারা এক সময় বিশ্বাস করতে শুরু করল যে, এ দেশে কোনোদিনও স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচার করা সম্ভব নয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে তা বাস্তবে প্রমাণিত করল।

মাহবুব রেজা : যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে এ দেশের প্রগতিশীল সুশীল সমাজ ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। শহীদজননী জাহানারা ইমাম থেকে শুরু করে আপনার মতো খ্যাতিমান ইতিহাসবিদও এই তালিকায় রয়েছেন। এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন।

মুনতাসীর মামুন : আসলে পঁচাত্তরের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টিকেই আমাদের শাসকরা বিতর্কিত করে তুলেছিল। এই বিতর্কের কাজটা তারা পরিকল্পিতভাবেই করেছে। নতুন প্রজন্মের সামনে বিভ্রান্ত রাজনীতি আর নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত মানুষগুলোকে বড় করে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে তারা তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণে অগ্রসর হতে থাকেন। কিন্তু একটা সময় মানুষের কাছে তাদের মনোবাঞ্ছার পূর্বাপর পরিষ্কার হয়ে যায়। তারা বিএনপির সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র ধরে ফেলে।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেকে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য কথাটা বলেছেন- রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তারা প্রকৃত সত্য ইতিহাসটা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন। এ জন্য আমি শাহরিয়ার কবিরসহ আরো বেশ কয়েকজনকে মামলা, হামলা ও কারাভোগও করতে হয়েছে। এ বিষয়ে আমি একটা কথা বলতে চাই- মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়- এই তিনটি বিষয় সম্পর্কে সঠিক ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি সবাইকে নিষ্ঠার সঙ্গে করে যেতে হবে।

মাহবুব রেজা : বলা হয়ে থাকে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপনার মতো এত বিশাল আয়তনে আর কেউ লেখালেখি করেনি- তো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই বিশাল পরিমাণ লেখা কী কারণে লিখলেন?

মুনতাসীর মামুন : আমি জীবনে কখনো আদর্শের সঙ্গে সমঝোতা করিনি। আমি যখন সাংবাদিকতার পেশা ছেড়ে চুয়াত্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি তখন বেশ টেনশনের মধ্যে ছিলাম। গবেষণা করার মধ্যদিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা করব- এমন প্রতিজ্ঞা নিয়ে এ কাজে ব্রত হলাম। পূর্ব বাংলা নিয়ে কাজ করতে করতে সামনে চলে এলো নানা বিষয়। বাম রাজনীতি করার কল্যাণে নীতি-আদর্শ নিয়ে কাজ করার অভিপ্রায় তো ছিলই। আমি যখন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি তখন কিছু বৈরী পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল আমাকে। বেশ মুষড়ে পড়েছিলাম। সে সময় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক আমাকে একটা কথা বলেছিলেন যা সবসময় আমি মেনে চলি- তা হলো তুমি যদি অধ্যবসায় আর পরিশ্রম করে যাও তাহলে দেখবা তুমি একদিন না একদিন সাকসেসফুল হইবাই হইবা। স্যারের সেই কথাটা আমি সবসময় মেনে চলি। আমি বিশ্বাস করি আমি যদি আদর্শ, নীতি ঠিক রেখে কাজ করে যাই তাহলে কোনো সমস্যাই সমস্যা হিসেবে আমার সামনে ঝামেলা সৃষ্টি করতে পারবে না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমি আমার বিশ্বাস থেকে, আদর্শ থেকে কাজ করে গিয়েছি- সত্য ঘটনা, অজানা কাহিনী, অনালোকিত অধ্যায়, সত্য তথ্য সেই সাধারণ মানুষের সামনে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায় এই বইটি বের হওয়ার পর থেকে সাধারণ মানুষ বেশ সজাগ হয়ে ওঠেন। সোচ্চার হয়ে ওঠেন। মূলত এই বইটি স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের স্তিমিত হয়ে যাওয়া আগ্রহ, কৌতূহল আর তৃষ্ণাকে শতগুণে বাড়িয়ে দেয়। এ বইটি বের হওয়ার পর থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিষয়টি মানুষকে এর প্রতি উসকে দেয়। এ বই প্রকাশের কৃতিত্ব শাহরিয়ার কবিরের। তারই ধারাবাহিকতায় বের হতে থাকে এ সংক্রান্ত নানা ধরনের গবেষণা, ইতিহাস, পর্যালোচনা। আমি যখন সাংবাদিকতা শুরু করি তখন সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিত্রকলা, ভ্রমণ, সমালোচনার পাশাপাশি আমার পছন্দের বিষয় ছিল অজানা তথ্য আর অনালোচিত অধ্যায়ের উন্মোচন করা। আমি মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার অজানা তথ্য আর অনালোকিত অধ্যায়ের ডকুমেন্টেশন করার চেষ্টা করেছি। পঁচাত্তর পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, স্বৈরাচারী সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আমি মনে করেছি আমার একমাত্র প্রধান কাজ হবে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রকৃত ঘটনা, সত্যকে আবিষ্কার করা, আমার গবেষণার পাশাপাশি আমি একই পরিমাণ মনোযোগ দিয়েছি এ বিষয়ে। মুক্তিযুদ্ধ শুধু বড়দের বিষয় না বরং তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছোটদের জন্য আরো বেশি অপরিহার্য বিষয়- এই বিষয়টা মাথায় রেখে আমি যতটা সম্ভব এ নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। জানি না কতটুকু করতে পেরেছি।

মাহবুব রেজা : মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপনি যে পরিমাণ কাজ আর গবেষণা করেছেন তা রীতিমতো ঈর্ষার পর্যায়ে চলে গেছে বলে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক গবেষক সমালোচকরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

মুনতাসীর মামুন : (স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বিনয়সহ কাঁধ, মাথা আর হাত নাড়িয়ে বললেন) না, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমি আর কী এমন কাজ করেছি! অন্যরা আমার চেয়ে অনেক বেশি কাজ করেছেন।

তবে কৃতিত্ব যদি দিতে হয় তাহলে একটি কাজের জন্য তা দেওয়া যেতে পারে। তা হলো মুক্তিযুদ্ধকোষ। আমি যখন প্রথম এর পরিকল্পনা করি তখন এ নিয়ে সবাই হাসাহাসি করেছিলেন। কিন্তু আমি আমার ছাত্রও সহকর্মীদের নিয়ে স্বেচ্ছা পরিশ্রমের ভিত্তিতে প্রথমে পাঁচ খণ্ডে কাজটি সমাপ্ত করি। তার বছর পাঁচেক পর ১২ খণ্ডে প্রায় ৮৫০০ পৃষ্ঠায় কাজটি শেষ হয়। ১২ খণ্ডে প্রকাশের ব্যাপারে সময় প্রকাশনীর ফরিদ আহমদকে কৃতিত্ব দিতে হয়। ঝুঁকি নিয়ে কাজটি তিনি করেছেন। বাংলাদেশে এ ধরনের কাজ প্রথম যা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে করার দরকার ছিল। অর্থমন্ত্রী তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রীকে ৫০০ কপি কেনার অনুরোধ করেছিলেন। সে অনুরোধ রাখা হয়নি। শিক্ষা-সংস্কৃতি মন্ত্রাণালয় অনেককে সাহায্য করে। এ ক্ষেত্রে আমরা কোনো সহায়তা পাইনি। কিন্তু সেই একই মন্ত্রণালয় এশিয়াটিক সোসাইটিকে এখন কয়েক কোটি টাকা দিয়েছে কয়েক খণ্ডে এ বই বের করাচ্ছে। তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু এখানে গবেষণা তা প্রকাশ করতে যে কত কাঠখড় পোড়াতে হয় তার উদাহরণ দিলাম এবং মন্ত্রীরা যে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধকে ভালোবাসেন এটি তার প্রকৃত উদাহরণ।

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় অনেক চেষ্টার পর ২০০ কপি কিনেছিল। কিন্তু শুনেছি সেখানে এত বিভিন্ন খাতে ও টাকা ব্যয় করতে হয়েছিল যে প্রকাশক আর এভাবে বই বিক্রিতে উৎসাহী হননি।

কিশোরদের জন্যও এক খণ্ডে মুক্তিযুদ্ধ কোষ করেছি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও বঙ্গবন্ধু কোষ করেছি। এগুলি কখনো প্রচারিতও হয়নি। এর জন্য আমাদের সামান্যতম প্রশাংসা ও কেউ করেনি।

আমি মনে করি যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী তাদেরও মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানা দরকার। রাজাকারের মন, পাকিস্তানি জেনারেলের মন, মুক্তিযুদ্ধে ১৩ নম্বর সেক্টর, ২৩ খণ্ডে গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ, সেইসব পাকিস্তাণি লিখে বেশ ভালো লেগেছে।

মাহবুব রেজা : শাহরিয়ার কবির বলছিলেন, আপনি আরো দুটি বড় কাজ করেছেন। গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ ও ১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালা এ বিষয় দুটি সম্পর্কে বলবেন?

মুনতাসীর মামুন : বিএনপি-জামায়াত আমলে যখন স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক, মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রের বিকৃতায়ণ শুরু হলো তখন আমার মনে হলো সেই সময়ে প্রকাশিত দেশি-বিদেশি পত্রিকার যদি বিষয় ভিত্তিক সংকলন করা যায় তা হলে তা দলিলপত্র হিসেবে থেকে যাবে। কারণ প্রজন্ম বা যারা গবেষণা করবেন তারা দেখবেন যে, সমসাময়িক কোনো বিবরণে জিয়ার নাম নেই। আমি আমার ছাত্র সহকর্মীদের নিয়ে কাজটি শুরু করি। গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ গ্রন্থমালার আমি সম্পাদক তবে এর ২২ খণ্ডের অনেকগুলো সংকলন করেছেন আমার সহকর্মীরা। তবে সিংহভাগ সংকলন আমার। এই অলাভজনক কাজটি করেছেন অনন্যার মুনিরুল হক। তার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। এই ২২ খণ্ড ও শিক্ষা/ সংস্কৃতি/ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় যদি দেশের বিভিন্ন কলেজে পাঠায় তাহলে সবাই উপকৃত হবেন। আমি মনে করি, মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র সংকলনের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় কাজ।

আপনি বোধহয় জানেন যে খুলনায় আমরা ১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর স্থাপন করেছি। দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান প্রথম। আমি এর সভাপতি। শাহরিয়ার, হাশেম খান, তারেক সুজাত, ডা. বাহারুল আলম প্রমুখ ট্রাস্টি। যখনি ১৯৭১ সালের গণহত্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হতে লাগল তখন আমার মনে হলো এ ক্ষেত্রেও প্রপার ডকুমেন্টশন করা দরকার। নতুন উদ্যোগ নিলাম গণহত্যা ইনডেস্ক বা গণহত্যা নির্ঘণ্ট প্রকাশনের। এ পর্যন্ত ২০টি গণহত্যার ওপর বই প্রকাশিত হয়েছে এবং এগুলোর লেখকরা সবাই নবীন। সরেজমিনে গিয়ে তারা কাজ করেছেন। এ প্রকাশনা নির্ভর করে অনুদানের ওপর। সুতরাং বলতে পারব না কতদিনে তা প্রকাশিত হবে। এ সিরিজের নাম ১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালা। আমি এর সম্পাদক।

মাহবুব রেজা : কেউ কেউ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ এখন অনেকের কাছে ব্যবসা-বাণিজ্যের উপাদান হয়ে গেছে- বিষয়টিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন।

মুনতাসীর মামুন : দেখেন এ বিষয়ে অনেকে অনেক কথাই বলেন। তবে এ বিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, মুক্তিযুদ্ধ এখনো আমাদের সবকিছুর মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধ এখন অনেকের করে কেটে খাওয়ার উপাদান হয়ে গেছে এ কথা যেমন সত্য তেমনি এ কথাও সত্য ওই সক করে কেটে খাওয়া লোকজন তো আর টিকে থাকবে না।

মাহবুব রেজা : মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেকেই পরিকল্পিতভাবে কিংবা ইচ্ছেকৃতভাবে (ভিন্ন মতাবলম্বী, ভিন্ন মতাদর্শী) বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। এসব থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

মুনতাসীর মামুন : শুধু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু কিছু জ্ঞানপাপী নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজেদের মতো করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন তাঁদের সম্পর্কে আমার কিছু বলার নেই। তাঁরা এটা ছড়াবেনই এখন যে বুদ্ধিজীবী জামায়াত কিংবা বিএনপি সমর্থন করে তাদের কাছে শুদ্ধ ইতিহাস আশা করা বোকামি! আমি এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না।

ডা. জাফরউল্লা চৌধুরীর মতো লোক যখন বলেন, কামরুজ্জামানের মতো আলবদর খুনির কাছে জাতির মাফ চাইতে হবে তখন বোঝেন অবস্থাটা কী! এসব ইতরামির কী মানে জানি না। হয়তো এ কথা সত্যি যে, জামায়াত প্রচুর টাকা দিচ্ছে অনেককে এসব বলার জন্য। তবে এটা ঠিক যে শেষ পর্যন্ত এসব ইতররা আস্তাকুড়েই নিক্ষিপ্ত হবেন।

মাহবুব রেজা : মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপনার সুলিখিত উপন্যাস জয় বাংলা পাঠক মহলে সমাদৃত হয়েছে অথচ এরপর আপনি আর সে পথে পা বাড়ালেন না। এর কারণ কী?

মুনতাসীর মামুন : জয় বাংলা লেখার পর অনেকের কাছ থেকে অনুরোধ এসেছে আমি যেন এ ধরনের লেখা আরো লিখি। কিন্তু আমার কাছে উপন্যাস লেখাটা বেশ কষ্টকর কাজ বলে মনে হয়েছে। যদিও এটি লিখে আমি অপার আনন্দ পেয়েছি, এ কাজে আরো মেধার দরকার। ওসবে আমার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলে মনে হয়। একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে আমি মনে করেছি উপন্যাসের মাধ্যমে নয়- অনুসন্ধান করে মুক্তিযুদ্ধের অনেক অনাবিষ্কৃত তথ্য, ঘটনা, কাহিনী, অধ্যায় পাঠকের সত্য ইতিহাসটা ধরিয়ে দেওয়া। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমি আমার কাজটুকু সর্বোচ্চ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কী হয়েছে বা কী হচ্ছে তা সময়ই বিচার করবে।

মাহবুব রেজা : আজকাল অনেক অনভিজ্ঞ মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অন্যের বই থেকে কেটে ছেটে ভুলভাল তথ্য দিয়ে এ বিষয়ে বই লিখছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য বই বিক্রি মুক্তিযুদ্ধের বই বাজারে বেশি বিক্রি হচ্ছে। অসাধু চক্রটি এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। এতে করে কী ক্ষতি হচ্ছে?

মুনতাসীর মামুন : আমি বিষয়টিকে এভাবে দেখতে চাই, তাহলো যে মানুষটা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেভাবে হোক বই লিখে, বের করে বিক্রি করছে সে তো কোনো অপরাধ করে ফেলিনি। মুক্তিযুদ্ধের বই বিক্রি হচ্ছে- বিষয়টি তো খুব পজিটিভ। আর যে লেখক এসব করে পাঠকের হাতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে দিচ্ছে তাকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হবে, কারণ সে তো আর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে চাকরির বয়স বাড়িয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে না কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননার ক্রেস্টে নকল সোনা মিশিয়ে দেশের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে না। তবে হ্যাঁ, মুক্তিযুদ্ধের তথ্যটা যেন ঠিকমত Cut and paste করা হয় সেদিকে লক্ষ রাখা উচিত। কিন্তু এ কথাও বলব, অন্তিমে পাঠক বা গবেষকদের কাছে এসব বই গ্রাহ্য হয় না। এই ঝোঁকটি ক্রমেই বাড়ছে সেটি আশঙ্কার কথা।

মাহবুব রেজা : কলেজ পর্যায়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে প্রথম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় নিয়ে পরীক্ষা হলো। এ ক্ষেত্রে আপনার অগ্রণী ভূমিকা সর্বজন বিদিত। কেমন লাগছে আপনার?

মুনতাসীর মামুন : ইতিহাস বিশেষ করে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস সর্বস্তরে অবশ্য পাঠ্য করার আন্দোলন দীর্ঘ দিন আমি করে আসছি। আমার সঙ্গে মেসবাহ কামাল, মো. সেলিম, প্রয়াত আতাহার, মাহবুবর রহমান, বাহার প্রমুখ ছিলেন। বছর তিনেক আগে বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী গঠন করে আমরা সংসদীয় কমিটির কাছে আবেদন করি। পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম ইতিহাস পড়ানোর জন্য সংসদীয় কমিটির কাছে আবেদন করা হয়। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এখনই সর্বস্তরে তা চালু হোক। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হারুন তখন উদ্যোগ নিয়ে এটি চালু করেন। এই প্রথমবার ২০ লাখ ছাত্র এ বিষয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। পাঁচ বছর যদি তা অব্যাহত থাকে তখন এক কোটি তরুণ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়বে। এর অভিঘাত তখন অনুধাবন করবেন। উল্লেখ্য, এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কখনো সহায়তা করেনি যদিও কাজটি ছিল তাদের।

মাহবুব রেজা : আপনি তো অনেক বিষয় নিয়ে লিখেছেন যেগুলোর সবই স্বীকৃতি পেয়েছে ও বহুলভাবে পাঠকনন্দিত। পাঠকের কাছে আপনি আপনাকে কোন পরিচয়ে পরিচিত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন?

মুনতাসীর মামুন : এখানেই আমার বিপদ। আমি তো আসলে অনেক মাধ্যমে কাজ করেছি। কোন পরিচয়ে পাঠক আমাকে, আমার কাজকে চিহ্নিত করবে সেটা পাঠকই ঠিক করবেন। এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে সব মিলিয়ে আমি একজন লেখক, সেটিই বোধহয় পরিচয়।

Post a comment