Everyday 10 to 5pm except Monday. Friday 3-5 pm

পাঠ্যবইয়ের রাজনীতি : ইতিহাস দখল, জাতিরাষ্ট্র এবং পরিচয়-নির্মাণের ইতিবৃত্ত

  • আবুল বাশার নাহিদ 

১৯৭১ সালে নয় মাসের তীব্র রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব এলাকার বাংলা ভাষাভাষীদের এক বৃহৎ অংশ একটি স্বাধীন মানচিত্রের চিত্র অঙ্কন করেন। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সর্ব নবীন স্বাধীন রাষ্ট্র কাঠামো। এ রাষ্ট্র কাঠামোর ভিত্তি ছিল উদার, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং সাম্য, সামাজিক ন্যায় বিচার ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয়। মূলত ইতিহাসের হাজার বছরের পরিক্রমায় বাংলা বিশেষত পূর্ব বাংলা বিভিন্ন দখলদারী, সাম্র্যজ্যবাদী ও উপনিবেশি শক্তির সাথে লড়াই করে নিজস্ব আঞ্চলিক সত্ত্বার আত্মপরিচয়ের বৈশিষ্ট্য পাকাপোক্ত করেছিল। ঔপনেবেশিক ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের মানুষ সংগ্রামের যে নজির স্থাপন করেছিল তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য এলাকার মানুষের জন্য ছিল অনুকরনীয়। অথচ এ অঞ্চলের মানুষ ব্রিটিশ শক্তি চলে যাওয়ার সময়ও তার কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা পায়নি। রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য তাদের আরো প্রায় চব্বিশ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করলেও মুক্তি আসেনি। বরং দীর্ঘদিন শোষণ, নিপীড়ন আর অধীনতায় রাখার জন্য যে কাঠামো  বৃটিশ উপনিবেশ এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশে  গড়ে উঠেছিল তা স্বাধীন দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদ্যমান ছিল। ক্ষমতা কাঠামোয় যারা ছিলেন তারা অধিকাংশই ঔপনেবেশিক মানসিকতা লালন-পালন ও ধারণ করেন। এই ক্ষমতা কাঠামো বলতে শুধু রাজনৈতিক দলের সংস্কৃতি বা ক্ষমতা বুঝাবে না বরং রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর সাথে যতগুলো অংশিজন রয়েছে তারা সবাই অন্তর্ভূক্ত থাকবে। ঔপনেবেশিক সময়ে ঔপনেবেশিক যে মানসিকতা  তৈরি হয়েছে এবং পরবর্তীকালে তা চলমান ছিল তার পিছনে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই যে কাঠামোগত অধীনতার মানসিকতা তৈরির অন্যতম হাতিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থাপনা তা নিয়ে এ অঞ্চলে তেমন কোন আলাপই নেই বললেই চলে। স্বাধীনতার প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন এ শিক্ষা কাঠামোর দুর্বলতা এবং এর প্রক্রিয়া, পাঠ্য বইয়ে কিভাবে ইতিহাসকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়, কীভাবে উপনিবেশি  শিক্ষা কাঠামো এবং মনন স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও বিদ্যমান আছে সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলাপ করে বই লিখেছেন। যদিও তিনি এর আগে এ শতকের প্রথম দশকের গোড়ার দিকে পাঠ্য বইয়ের রাজনীতি নিয়ে আলাপ করেছেন। তিনি ঔপেনিবেশিকোত্তর ঔপনেবেশিক মন  শিরোনামে বই লিখেছেন। তিনি তার লেখনির মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন ঔপনেবেশিক কাঠামোতে গড়া মনন দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করা যে সম্ভব না  তা তুলে ধরেন।

আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু মূলত অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন রচিত ইতিহাস হত্যা এবং পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যবই (১৯৪৯-২০২০) পর্যালোচনা। এ বইয়ে তিনি পাকিস্তান আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কীভাবে ইতিহাসকে উপস্থাপন করা হইছে এবং কীভাবে পাঠ্য বইকে নিয়ে রাজনীতি করা হয়েছে তা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। আমরা এ গ্রন্থ পর্যালোচনা করতে গিয়ে পাঠ্য বই নিয়ে যে রাজনীতি এবং এ রাজনীতির প্রেক্ষাপট নিয়ে  বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করব। মনে রাখতে হবে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সূচনা ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তির হাত ধরে সূচনা হলেও ইতিহাস দখলের ইতিহাসের সূচনা ব্রিটিশরা করেননি  বরং ইতিহাস দখলের ইতিহাস বহু পুরানো।

পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তারের ইতিহাস দীর্ঘ। প্রাচীন কালে সাম্রজ্যবাদী শক্তিগুলো বিভিন্ন অঞ্চল দখলে বা আধিপত্য বিস্তারে সামরিক শক্তিকেই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু মধ্যযুগের শেষ পর্বে এসে পাশ্চত্যের ঔপনেবেশিক শক্তিগুলো সারা পৃথিবীতে যে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল তা শুধুমাত্র তাঁর সামরিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে টিকেনি। উপনিবেশে তার ক্ষমতা কাঠামো টিকিয়ে রাখার জন্য জরুরি হয়ে উঠে উপনিবেশের জনগণের  মনস্ত্বত্তে প্রবলভাবে সাংস্কৃতিক আধিপত্য (cultural hegimony)  বিস্তার  করা। এ আধিপত্য বা হেজিমনি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে ঔপনিবেশিক শক্তির উৎপাদিত জ্ঞান। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো তাঁর উৎপাদিত জ্ঞান বিপণনের মাধ্যম (ট্যুলস) হিসেবে বহুবিধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছেন। তবে বিপণনের প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন শিক্ষা কাঠামোকে। তবে এ শিক্ষা কাঠামো তৈরিতেও বহু প্রতিষ্ঠানের কর্ম তৎপরতা ছিল। পাশ্চত্যের উৎপাদিত জ্ঞান উপনিবেশে বিপণনে বহু প্রতিষ্ঠানের সাথে  খ্রিষ্টান মিশনারিদের ভূমিকা স্পষ্ট । খ্রিষ্টান মিশনারিরা ধর্ম প্রচারের নামে যে জ্ঞান উপনিবেশের স্থানীয়দের কাছে বিপণন করেছিল বা  জ্ঞানের যে কাঠামো উপস্থাপিত করেছিল তা মূলত ইউরোপীয়দের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের হাতিয়ার হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এ শ্রেষ্ঠত্বের আধিপত্য বিস্তারের জ্ঞান প্রক্রিয়া শুধু মাত্র ধর্মীয় বিষয়াবলীতে সীমাবদ্ধ ছিল না বরং মিশনারিরা ইউরোপীয় শিক্ষা বিস্তারের জন্য শিক্ষা  প্রতিষ্ঠান (কাঠামো) গড়ে তুলেন । দুনিয়াব্যাপী অসভ্য, কালোদের সভ্য করার যে দায়িত্ব  ইউরোপীয়দের (white man burden) ওপর ঈশ্বর অর্পণ করেছেন, মিশনারিদের এ ধরনের মানস মূলত ইউরোপীয় সাদা চামড়ার ঔপনেবেশিক শোষকদের শোষণ প্রক্রিয়াকে বৈধতা এবং সহজ করেছিল। মিশনারিরা উপনিবেশে শিক্ষা কাঠামো গড়ে সেখানে যে শিক্ষা বা বয়ান শিখানো হত এবং ধর্মান্তকরণের প্রচেষ্টা করা হত তা ঔপনেবেশিক ক্ষমতা কাঠামোকে সুসংহত করার পক্ষে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছিল।

আফ্রিকায় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মিশনারিদের ভূমিকা ছিল ‘টর্চবেয়ারার’ বা আলোকবর্তিকার ন্যায়। অন্যদিকে ভারতীয় উপনিবেশ স্থাপনে মিশনারিদের সরাসরি ভূমিকা ছিল না বটে তবে ক্ষমতার কাঠামো সুসংহত করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা ব্যাপকভাবে লক্ষনীয়। মিশনারিরা মনে করতেন ইউরোপিয়নরা ধর্ম, কর্ম , জীবনাচরণে আফ্রিকা, ভারতের জনগণের থেকে শ্রেষ্ঠ। এই বক্তব্যের ঐতিহাসিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যাবে  মিশনারিদের খ্রিষ্টান ধর্ম দিকে আহবানের পদ্ধতি এবং তাদের তৎকালীন কর্মকান্ডের খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে। ভারতীয় উপমহাদেশে মিশনারিরা বৃটিশদের প্রতিকূল পরিবেশে ধর্ম প্রচারের কাজ শুরু করলেও অল্প সময়ের ব্যবধানে শাসকের এজেন্ডার সাথে মিশনারিদের এজেন্ডা একই সমান্তরালে এসে দাঁড়ায়।

মূলত মিশনারিদের হাত ধরে ভারতে সেকুল্যার শিক্ষা কাঠামোর সূচনা হয়। পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক শাসকরা সে জ্ঞান কাঠামোতে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করে। এই মিশনারিদের উৎপাদিত জ্ঞান যা উপনিবেশে পরিবেশন হয়েছিল সেক্যুলারের তকমা লাগিয়ে তা মূলত ইউরোপীয় সমাজ কাঠামো, রাষ্ট্র কাঠামো এবং ইউরোপীয় শাসকরা এ সকল বর্বর অথবা অর্ধ সভ্যদের  শাসন করার অধিকার রাখে এমন মানস স্থানীয়দের মধ্য তৈরিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। মূলত এ জ্ঞান কাঠামো ঔপনেবেশিক শাসকদের অবৈধ শাসনের নৈতিক ভূমিকার পাটাতন তৈরিতে সাফল্য রাখে। এ জ্ঞান বিপণন প্রক্রিয়ায় যতগুলো মাধ্যম বা ট্যুলসকে ব্যবহার করেছিল তার মধ্যে পাঠ্যবই (টেক্সবুক) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। পাঠ্যবইয়ের মধ্য দিয়েই মূলত ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের মিথ্যে অহমিয়া স্থানীয়দের মন জগতে প্রভাব বিস্তারে কাঠামোগত ভূমিকা রাখে। পাঠ্যবই বা পাঠ্যক্রমের সাথে মূলত ক্ষমতা কাঠামোর গভীর এবং নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। ফলে পাঠ্যবইয়ে মূলত ফুটে উঠে ক্ষমতা কাঠামোর পক্ষে উৎপাদিত বয়ান (ন্যারেটিভ)। এই প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে শুরু হয় স্কুল থেকে কারণ ছোটো বেলা থেকে তাকে নতুন মতবাদে বা ডক্ট্রিনের সাথে পরিচিত করা যাবে তা তার মন জগতে প্রভাব বিস্তার করবে। শাসকের অনুকূলে মানস তৈরির জন্য ইতিহাস বিষয় বস্তু খুব কার্যকরী ভূমিকা রাখে। ফলে শাসক গোষ্ঠীর নজরে থাকে বিশেষত ইতিহাস বিষয়বস্তুর দিকে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের যে সূচনা  হয়েছিল তার ভিত্তি  ছিল ধর্ম। কিন্তু এ পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনে  ধর্ম ভিত্তিক দলের ভূমিকা ছিল না বা ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা প্রথম সাড়ির ছিল না। বা ইসলামিক রাষ্ট্র হবে ব্যাপারটা এমন ছিল না। এ ক্ষেত্রে আমরা যোগেন মণ্ডলের বিষয়টা স্মরণ করতে পারি। যিনি তৎকালীন পূর্ব বাংলার হিন্দু তফসিলি সম্প্রদায়ের নেতা ছিলেন। তিনি পাকিস্তান গণ-পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রে  থাকতে চেয়েছিলেন  কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে তার জন্য কঠিন হয়ে উঠে। তাকে পাকিস্তান ছেড়ে চলে যেতে হয়। আবার জামাতে ইসলাম রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা আমির মাওলানা মওদুদী ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবীর বিরোধিতা করেছিলেন এই বলে যে এটা ইসলামি রাষ্ট্র হবে না। অথচ পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে এ দল পাকিস্তানকে একটি ইসলামি রাষ্ট্র বানানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। তাদের সাথে অধিকাংশ ধর্মভিত্তিক দলগুলো একই সুরে কথা বলেছিল। তারা পাকিস্তান ধারণাকে ইসলামিকিকরণ করেছিল। তাদের এ প্রচেষ্টা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের শোষণকে বৈধতা  দিয়েছিল এবং সকল নিপীড়নের বৈধতা তৈরি করেছিল। যার ফলাফল দেখা যায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী যখন গণহত্যা চালাচ্ছিল তখন ধর্মীয় গোষ্ঠী একটি অংশ এ গণহত্যার বৈধতা দেওয়ার জন্য বহুবিধ ব্যাখ্যা এবং ন্যারেটিভ তৈরি করেছিল। ফলে পাকিস্তানি উপনিবেশি শক্তি তার শোষণকে বৈধতা দেওয়ার জন্য এরকম বহু ন্যারেটিভ উৎপাদনকারীর সাহায্য নিয়ে থাকে।

১৭৮৯ সালে ফরাসি বিল্পবের মধ্য দিয়ে ইউরোপে জাতি রাষ্ট্র (Nation State) উত্থানের জোয়ার শুরু হয়। মধ্যযুগে ইউরোপে যে সমান্ততন্ত্র এবং সমান্ততন্ত্রের পতনের পরে শক্তিশালী রাজতান্ত্রিক শাসন কাঠামো চলে আসছিল সেখানে জনগণের মনন বা মানস শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেনি। ধর্ম সে ব্যবস্থাপনায় খুব জরুরি উপাদান হিসেবে হাজির ছিল। সমান্ততান্ত্রিক কাঠামোতে ধর্মীয় নেতারা ক্ষমতা কাঠামোর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল; ক্রসেডের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় নেতাদের আধিপত্যের অবসান আর রাজতন্ত্রের শক্তিশালী হিসেবে আবির্ভাব রাজাকে রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং ধর্মীয় ক্ষমতা কাঠামোতে পরাক্রমশালী হয়ে উঠেন। ফলে সেখানে জনগণের অংশগ্রহণ কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। কিন্তু জনগণ রাজতন্ত্রের পরাক্রমশালী অবস্থানকে প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে, বিক্ষুব্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় বলয় থেকে বের হয়ে স্থানীয় উপাদানকে প্রাধান্য দিয়ে জাতীয় পরিচয় (National Identity) নির্মাণ-বিনির্মাণ করার চেষ্টা শুরু করে। প্রতিষ্ঠা করেন জাতি রাষ্ট্র (Nation State)। জাতি রাষ্ট্র তার নাগরিকের কাছে নিঃশর্ত আনুগত্য দাবী করে। রাষ্ট্র তার জনসাধারণকে নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়। এ প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম শিক্ষাক্রম তথা পাঠ্যবই অন্যতম। কারণ এই পাঠ্যক্রমের মধ্যে দিয়েই  একজন নাগরিককে তার নিজ জাতি রাষ্ট্রের সম্পর্কে অবহিত করা হয়। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যশীল করে তুলে। জনগণকে জাতীয়তাবাদী প্রতীকগুলোর সাথে পরিচিত করায়। জনগণের মন জগতে নিজ জাতি বা রাষ্ট্রের প্রতি প্রবলভাবে ভাবাকাক্রান্ত করে তুলে। নিজেকে অন্য থেকে শ্রেষ্ঠ মনে করা শুরু করে। ঔপনেবেশিক শক্তি যেমন তার উপনিবেশে বিভিন্নভাবে এ আধিপত্য স্থানীয়দের মন জগতে বিস্তার করত তেমনি এই নব গঠিত জাতি রাষ্ট্রগুলো তার নাগরিককে বিভিন্নভাবে আনুগত্যশীল করে তুলে রাষ্ট্রের প্রতি। কোন কোন ক্ষেত্রে শাসকগোষ্ঠী তার নিজ স্বার্থে উৎপাদিত ইতিহাসের বয়ানকে প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৪০ এর দশকের মাঝামাঝি এসে ইউরোপীয় ঔপনেবেশিক শক্তিগুলো থেকে উপনিবেশগুলো স্বাধীনতা লাভ করতে থাকে। এ ধারাবাহিকতা চলতে থেকে গত শতকের প্রায় শেষ পর্যন্ত। উপনিবেশ থেকে সদ্য স্বাধীনতা লাভ করা রাষ্ট্রগুলো জাতি রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। ঔপনেবেশিক শাসকদের দীর্ঘ শোষণ, নির্যাতন, আর নিপীড়ন বিরোধী সংগ্রাম আর উপনিবেশের জ্ঞান কাঠামোর মধ্য দিয়ে উপনেবেশের স্থানীয়দের মধ্যে যে মিথিস্ক্রিয়া তৈরি করেছিল তাতে বিউপনিবেশায়নের পরে উপনিবেশ পূর্ববর্তী কাঠামোতে ফিরে যাওয়া কঠিন হয়ে উঠে। কারণ ঔপনেবেশিক শোষকরা উপনিবেশ স্থাপনের সময়ে পূর্ববর্তী সকল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনা বাতিল করে ইউরোপীয় মডেল প্রতিস্থাপন করেছিল। উপনিবেশের জনগণ হাজার বছর ধরে যে ব্যবস্থাপনার সাথে পরিচিত ছিল তা এসব শোষকরা ভেঙ্গে ফেলে। বিশেষত পূর্ববর্তী রাজনৈতিক কাঠামোর যে ভৌগলিক সীমারেখা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছিল তা পুরোপুরি বদলে ফেলে। উপনিবেশ পূর্ববর্তী বিভিন্ন জাতির যে রাজনৈতিক সাংস্কৃতি ছিল তা এক ঔপনেবেশিক শোষক কাঠামোর অধীনে নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে চলে যায়; ফলে বহু জাতি গোষ্ঠী এক সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন করেন। এই আন্দোলন তাদের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া সৃষ্টি করে। সেখানে একটি সাধারণ চেতনা বা বৈশিষ্ট্যকে ঐক্যের প্রতীক ধরে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন করে। তাদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন স্বাধীনতা এনে দেয়। কিন্তু উপনিবেশ থেকে সদ্য স্বাধীন হওয়া জাতিগুলো নতুন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হল। দেখা গেল উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে একটি ভূখণ্ডের বিভিন্ন জাতি সত্ত্বার লোকের সক্রিয় আন্দোলনে স্বাধীনতা লাভ করল। কিন্তু নতুন যে রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হচ্ছে সেখানে কেউ প্রাধান্য বিস্তার করছে আবার কেউ কেউ প্রান্তিক হয়ে যাচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বা ক্ষমতাবানদের ইচ্ছে অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্র কাঠামো এবং পরিচয় নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানে বহু জাতির ধারণাকে উপেক্ষা করে একটি কল্পিত জাতির উপস্থাপন করা হয়।

এর উজ্জ্বল নমুনা হতে পারে ভারত বা পাকিস্তানের উদাহরণ। এ রাষ্ট্র দুটি কোন ভাবেই একক জাতি হিসেবে আখ্যায়িত হতে পারে না। ফলে এ রাষ্ট্রের ভিতরে যে বহু জাতির বসবাস তাদের নিজস্বতাকে আড়াল করে একক জাতি রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়। ফলে এসব রাষ্ট্রে আধিপত্যবাদী বা ক্ষমতা কাঠামোতে যারা প্রভাব বিস্তারকারী তারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে প্রাধাণ্য দিয়ে জাতি রাষ্ট্রের  সংজ্ঞা তৈরি করে। এজন্য প্রয়োজন পড়ে নতুন করে ইতিহাস লেখার (Re-writing of History) যা এসব  এলাকার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন জাতির বৈচিত্রকে ছাপিয়ে এক জাতি রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের সুসংহত (integrate) বা জাতীয় ঐক্য (national unity) প্রকাশ করতে চেষ্টা করে। তবে অসুবিধা হল এই নতুন ইতিহাস লিখতে গিয়ে ইতিহাসের বহু তথ্যকে বিকৃত (distorted) করা  হয় অথবা  কখনো কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠের (Dominate culture) বা ক্ষমতাশীনদের নিজস্ব বয়ান লিখতে গিয়ে ইতিহাসকে ভুলভাবে  উপস্থাপন করা হয়।

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তার বইয়ের ভূমিকায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। প্রথমত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে প্রাথমিক আর মাধ্যমিকে কী কী পড়ানো হয়েছে তার কোন বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত পাঠ্য বইয়ে ইতিহাসের নামে যা পড়ানো হয়েছে তার অধিকাংশ খন্ডিত ইতিহাস, সাম্প্রদায়িকতা মনোভাবাপন্ন ইতিহাস অথবা মিথ্যে ইতিহাস। তৃতীয়ত স্বাধীনতা পরবর্তী শাসন ক্ষমতায় ডানপন্থীরা দীর্ঘ সময় ছিল ফলে পাঠ্যবইয়ে প্রধান টার্গেট ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। তিনি দেখান কিভাবে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এই বিকৃত ইতিহাসকে সঠিক রুপে তুলে ধরার জন্য বিদ্যমান বহু কাঠামোর সাথে সংগ্রাম করে পাঠ্যবইয়ে নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে তুলে ধরা হয়। চতুর্থত তিনি দেখান কিভাবে ইতিহাসের বক্তব্যগুলো রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে কার ভূমিকা কেমন ছিল তা তিনি আলাপ করেন। তিনি দেখান অতি সাম্প্রতিক হেফাজতে ইসলাম পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যবই সংশোধণের যে প্রস্তাব দিয়েছে তার প্রেক্ষাপট। অধ্যাপক মামুন পাঠককে অন্য একটি বিষয়ে দৃষ্টি আলোকপাত করেন। তিনি দেখান ১৯৪৯ সালে পাঠানো এক নির্দেশনায় ড কুদরত –এ- খুদা সকল স্কুলে ইসলাম জিন্দা রাখার জন্য নির্দেশনা পাঠান তখন তিনি পূর্ব পাকিস্তানের ডি.পি.আই। আবার সেই একই ব্যক্তি ১৯৭২ সালে ধর্ম নিরপেক্ষ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট প্রদান করেন। লেখক বলতে চেয়েছেন ১৯৪৭ সালে বুকের ভিতর পাকিস্তানি একটি ডাকটিকেট সেট করা হয়েছিল তা এখনো তুলে ফেলা সম্ভব হয়নি। তিনি বলতে চেয়েছেন পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকরা যে মানস গঠন করে দিয়েছে তা এখনো বিদ্যমান। এ মানস গঠনে পাকিস্তানিরাও পাঠ্যবইকে ব্যবহার করেছিল।

বই সম্পর্কিত তথ্য:
বইয়ের নাম: ইতিহাস হত্যা এবং পাঠ্যক্রম ও পাঠবই (১৯৪৯-২০২০)
লেখকের নাম: মুনতাসীর মামুন
প্রকাশক: মাওলা ব্রাদার্স
প্রকাশ সাল: ২০২২ 
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২২২

Post a comment